খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 6শে কার্তিক ১৪৩২ | ২১ই অক্টোবর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
দেশের শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষ পদ—মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক (ডিজি) পদ নিয়ে চলছে নজিরবিহীন দৌড়ঝাঁপ। মাত্র ১৪ মাসে তিন ডিজি পরিবর্তনের পর এবার নতুন ডিজি নিয়োগে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রকাশ্যে আবেদন আহ্বান করেছে—যা শিক্ষা প্রশাসনের ইতিহাসে এক নতুন দৃষ্টান্ত। তবে এই স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়ার ঘোষণার আড়ালেই চলছে তদবির, প্রচারণা ও পাল্টা প্রচারণার এক জোর প্রতিযোগিতা।
শুধু শিক্ষা ক্যাডারের ১৪তম ও ১৬তম ব্যাচ থেকেই ৬১ জন সিনিয়র কর্মকর্তা ডিজি পদের জন্য আবেদন করেছেন বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক ছাত্রদল নেতাসহ একাধিক সাবেক মন্ত্রীদের একান্ত সচিব (পিএস) ও সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস)। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র দাবি করেছে, মোট আবেদনকারীর সংখ্যা ইতোমধ্যে ২০০ ছাড়িয়েছে।
গত ১৪ অক্টোবর নানা বিতর্ক ও প্রশাসনিক অস্থিরতার প্রেক্ষিতে অধ্যাপক ড. আবুল কালাম আজাদ খানকে ডিজির পদ থেকে সরানো হয়। তার আগে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে আরও দুই ডিজিকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। শিক্ষা প্রশাসনের ইতিহাসে এত কম সময়ে তিন ডিজি পরিবর্তনের নজির আর নেই।
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে ডিজি নিয়োগ নিশ্চিত করতে এবার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মতো উন্মুক্ত আবেদন আহ্বান করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ জন্য দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
প্রধান নিয়োগ কমিটির নেতৃত্বে আছেন শিক্ষা উপদেষ্টা, আর সাচিবিক দায়িত্বে থাকবেন অতিরিক্ত সচিব (কলেজ) মজিবর রহমান। এ কমিটিতে মন্ত্রণালয়ের আরও পাঁচজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা যুক্ত থাকবেন। পাশাপাশি আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি প্রাথমিক স্ক্রুটিনি কমিটি করা হয়েছে, যার আহ্বায়ক মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব (কলেজ)। এই কমিটি আবেদনকারীদের প্রশাসনিক যোগ্যতা, মাঠ অভিজ্ঞতা ও প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র যাচাই করে সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করবে, যা পরে মূল কমিটির কাছে যাবে। মূল কমিটি সাক্ষাৎকার ও পর্যালোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত প্রার্থী সুপারিশ করে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পাঠাবে।
ডিজি হওয়ার দৌড়ে বর্তমানে ডজনখানেক কর্মকর্তার নাম আলোচনায় রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন— কাজী মো. আবু কাইয়ুম, পরিচালক (মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন উইং), যিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং ২০০১ সালের সরকারে এক মন্ত্রীর এপিএস ও পরে পিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অধ্যাপক বি এম আব্দুল হান্নান, পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন শাখা), বর্তমানে ডিজির রুটিন দায়িত্বে আছেন। ড. খন্দকার এহসানুল কবির, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, সাবেক অধ্যক্ষ সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যিনি ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ড. ছদরুদ্দীন আহমদ, অধ্যক্ষ, সরকারি তিতুমীর কলেজ;
ড. কাকলী মুখোপাধ্যায়, অধ্যক্ষ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ; ড. এ কিউ এম শফিউল আজম, পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন); মো. সাঈদুর রহমান, পরিচালক (প্রশিক্ষণ শাখা); ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল, পরিচালক (মাধ্যমিক শাখা), যিনি অতীতে তৎকালীন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের এপিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কাজী মো. আবু কাইয়ুম বলেন, “উন্মুক্ত আবেদন পদ্ধতি ইতিবাচক উদ্যোগ। এতে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনের সুযোগ বাড়বে। সদ্য সাবেক ডিজি প্রশাসনিক সক্ষমতার অভাবে অধিদপ্তর সামলাতে পারেননি। আমাকে দায়িত্ব দিলে সেই ঘাটতি পূরণে সক্ষম হবো বলে বিশ্বাস করি।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, শিক্ষা ক্যাডারে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি ও নিয়োগে বৈষম্য চলছে—যা সমাধানে তিনি উদ্যোগ নেবেন।
অন্যদিকে রুটিন দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক আব্দুল হান্নান বলেন, “আমি কোনো তদবির করছি না। সরকার যাকে উপযুক্ত মনে করবে, তাকেই দায়িত্ব দেবে।”
ড. খন্দকার এহসানুল কবির মন্তব্য করতে রাজি না হলেও বলেন, “আমি সরকারি কর্মকর্তা, সরকার যেখানে দায়িত্ব দেবে, সেখানেই কাজ করব।”
এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার সূচনা হয় সদ্য বিদায়ী ডিজি অধ্যাপক ড. আবুল কালাম আজাদ খানকে ওএসডি করার পর। তার আগেও ফেব্রুয়ারিতে অধ্যাপক ড. এহতেসাম-উল হককে সরানো হয়, এবং তারও আগে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতা থাকা অধ্যাপক নেহাল আহমেদের চুক্তি বাতিল করা হয়েছিল।
ফলে এক বছরের সামান্য বেশি সময়ে তিন ডিজি বদলি হওয়ায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবার একটি স্থিতিশীল ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় মাউশির মহাপরিচালক পদের জন্য প্রকাশ্যে আবেদন আহ্বানের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়—যা শিক্ষা প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
খবরওয়ালা/এমএজেড