সৈয়দ আসাদ উজ জামান( মিনার)
প্রকাশ: ২১ই মার্চ ২০২৫, ১২:৭ পিএম
মানব সমাজে দুটি প্রধান শ্রেণি লক্ষ্য করা যায়: সাধারণ মানুষ ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। শক্তিশালী ব্যক্তিদের কার্যক্রম দেখে মনে হয়, তারা যেন সৌরজগতের সূর্যের চেয়েও বেশি ক্ষমতাধর। কিন্তু বাস্তবতা কি তাই? সৌরজগতের সূর্যের ভর যেখানে ৯৯.৮৬%, সেখানে কোনো রাষ্ট্র বা সমাজে কি এমন একজন ব্যক্তি আছেন যার একক ক্ষমতা বা সম্পদ এই অনুপাতে পৌঁছাতে পেরেছে? নাকি এটি কেবল কিছু মানুষের সম্মিলিত আধিপত্য? তাহলে কেন কিছু সাধারণ মানুষ স্বতন্ত্রতা হারিয়ে ক্ষমতাসীনদের তাঁবেদার হয়ে পড়ে?
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের সৌরজগতের কাঠামো ও সামাজিক বাস্তবতার তুলনা করা প্রয়োজন। সৌরজগতে প্রতিটি গ্রহ ও উপগ্রহ নিজ নিজ কক্ষপথে পরিচালিত হয়ে স্বতন্ত্রতা বজায় রাখে। কিন্তু মানবসমাজে অনেকেই আত্মসম্মানবোধ বিসর্জন দিয়ে প্রভাবশালীদের অনুসরণে অন্ধ হয়ে পড়ে। কেন এই পার্থক্য?
সৌরজগতের নীতি ও মানবসমাজের বাস্তবতা
সৌরজগতের গ্রহ ও উপগ্রহ দুটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি অনুসরণ করে:
১. নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা
গ্রহগুলো সূর্যের নিকটতম ও দূরতম বিন্দুর (Perihelion & Aphelion) মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে। যদি তারা খুব কাছাকাছি চলে আসে, তাহলে মহাকর্ষ বল তাদের ধ্বংস করে ফেলবে। আবার যদি তারা খুব দূরে সরে যায়, তবে মহাশূন্যে হারিয়ে যাবে।
মানবসমাজেও সীমাহীন আনুগত্য ও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা, উভয়ই ক্ষতিকর। যারা অত্যধিক আনুগত্য দেখায়, তারা নিজেদের স্বতন্ত্রতা হারিয়ে চামচামির সংস্কৃতিতে নিমজ্জিত হয়। অন্যদিকে, যারা সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন, তারা সমাজে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। তাই একটি পরিমিত সম্পর্ক বজায় রাখাই আত্মপরিচয়ের সঠিক পথ।
২. প্রভাবমুক্ত থাকার নীতি
নিউটনের গতি নীতি অনুযায়ী, “যদি কোনো সিস্টেম বাইরের কোনো বল দ্বারা প্রভাবিত না হয়, তবে তার কৌণিক ভরবেগ সংরক্ষিত থাকবে।” অর্থাৎ, কোনো গ্রহ যদি তার নিজস্ব গতি ও শক্তি ধরে রাখে, তবে সেটি কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হবে না।
কিন্তু মানবসমাজে অনেকেই প্রভাবশালীদের আকর্ষণে এতটাই আবিষ্ট হয়ে পড়ে যে তারা আত্মসম্মানবোধ হারিয়ে ফেলে। তারা ক্ষমতার কেন্দ্রের এতটা কাছে চলে আসে যে নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। ফলস্বরূপ, তারা কেবল একদল অনুগত অনুচরে পরিণত হয়।
সামাজিক বাস্তবতা: ভোটার, গ্রাহক ও সাধারণ মানুষ
সাধারণ মানুষ কেবল বিশেষ সময়ে সম্মানিত হয়:
ভোটের সময় তারা ‘সম্মানিত ভোটার’
অর্থ প্রদানের সময় তারা ‘সম্মানিত গ্রাহক’
কিন্তু বাকি সময়ে তারা সাধারণ নাগরিক, যাদের কথা কেউ শোনে না।
প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কীভাবে এই পরিস্থিতি তৈরি করে? কিছু মানুষ সুবিধা পাওয়ার আশায় প্রভাবশালীদের তোষামোদ করতে শুরু করে। তাদের মাধ্যমে সমাজের বৃহৎ জনগোষ্ঠী একটি শোষণমূলক ব্যবস্থার শিকার হয়।
তাহলে প্রশ্ন হলো, কোনো দেশ বা অঞ্চল কি আছে যেখানে আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মানুষ প্রভাবশালীদের তোষামোদি না করে নিজের মর্যাদা রক্ষা করে চলতে পারে?
ধর্ম ও দর্শনের দৃষ্টিকোণ
পবিত্র কুরআন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা তাদের অবস্থা পরিবর্তন করে।” (সূরা রাদ, আয়াত ১১)
এটি প্রমাণ করে যে কেউ নিজের আত্মসম্মান রক্ষা না করলে, কেউ তাকে সম্মান দেবে না। মানুষকে নিজের অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে নিজস্ব কৌশল ও আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন করতে হবে।
অন্যদিকে, ভগবদ গীতা বলে:
“তুমি কর্ম করো, কিন্তু ফলের আশা করো না।” (অধ্যায় ২, শ্লোক ৪৭)
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সাধারণ মানুষ পরিশ্রম করে, কিন্তু ফল ভোগ করে ক্ষমতাশালীরা। তারা শ্রম দেয়, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তাদের হাতে থাকে না। ফলে ৯৯.৮৬% জনগণ সাধারণ থেকে যায়, আর শীর্ষ ০.১৪% ক্ষমতাবান হয়।
কীভাবে আত্মপরিচয় ও মর্যাদা রক্ষা করা যায়?
আমরা যদি সৌরজগতের শিক্ষা থেকে কিছু গ্রহণ করি, তবে আমরা বুঝতে পারি যে প্রকৃত শক্তি আসে ভারসাম্য থেকে। যে সমাজ নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে সম্পর্কের দূরত্ব নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে উন্নত হতে পারে।
আজকের সমাজে অনেকেই নিজেদের স্বার্থ ও আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতাশালীদের অনুসরণ করছে। কিন্তু প্রকৃতি আমাদের শেখায়—সত্যিকারের শক্তি আসে নিজের অবস্থান ধরে রেখে, নিজস্ব কক্ষপথে চলার মধ্য দিয়ে।
তাহলে প্রশ্ন হলো: আপনি কি নিজের কক্ষপথ বজায় রেখে চলতে প্রস্তুত, নাকি ক্ষমতার আকর্ষণে আপনার আত্মপরিচয় হারিয়ে ফেলবেন?
খবরওয়ালা/ এমএজেড
মন্তব্য