খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 18শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ২ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রয়াণ-পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। শনিবার মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ বাহিনীর বিমান হামলায় খামেনির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে তেহরান তাদের সামরিক শক্তির চূড়ান্ত প্রদর্শনী ও চরম প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর ইতিহাসের সবচাইতে বিধ্বংসী আক্রমণ চালাতে বদ্ধপরিকর। ইতিমধেই কাতার, বাহরাইন, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মার্কিন স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে তেহরান পাল্টা আঘাত হেনেছে, যা অঞ্চলটিতে এক ভয়াবহ যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দিয়েছে।
রণক্ষেত্রে ইরানের সবচেয়ে বড় চমক হলো তাদের অস্ত্রভাণ্ডারে থাকা পশ্চিমা প্রযুক্তির ছোঁয়া। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান গত কয়েক দশকে মার্কিন ও ইউরোপীয় অস্ত্রশস্ত্রের ‘রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা হুবহু নকল তৈরিতে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দান থেকে রাশিয়ার জব্দ করা মার্কিন ‘জ্যাভলিন’ অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল কিংবা ‘স্টিঙ্গার’ এয়ার-ডিফেন্স সিস্টেমগুলো তেহরানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইরানের প্রকৌশলীরা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এই প্রযুক্তিগুলো বিশ্লেষণ করে নিজেদের সংস্করণ তৈরি করেছেন। এর আগে মার্কিন ‘সেন্টিনেল’ ড্রোনের আদলে তৈরি ইরানি ড্রোন বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল।
ইরানের টিকে থাকার লড়াইয়ের মূলে রয়েছে তাদের বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার। নিমে ইরানের প্রধান কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রদান করা হলো:
| অস্ত্রের নাম | ধরন | পাল্লা/সক্ষমতা | বিশেষ বৈশিষ্ট্য |
| ফাত্তাহ-১ | হাইপারসনিক মিসাইল | ১৪০০-২০০০ কি.মি. | শব্দের চেয়ে ১৫ গুণ দ্রুত ও রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম। |
| শাহাব-৩ | ব্যালিস্টিক মিসাইল | ২০০০ কি.মি. | সমগ্র ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্যভেদী। |
| শাহেদ-১৩৬ | কামিকাজে ড্রোন | ২৫০০ কি.মি. | সস্তায় তৈরি এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিভ্রান্ত করতে পটু। |
| মোহাজের-৬ | নজরদারি ও অ্যাটাক ড্রোন | ২০০ কি.মি. | লেজার গাইডেড বোমা বহন করতে সক্ষম। |
| সেজজিল | সলিড-ফুয়েল মিসাইল | ২০০০-২৫০০ কি.মি. | অত্যন্ত দ্রুত উৎক্ষেপণযোগ্য এবং নিখুঁত লক্ষ্যভেদী। |
ইরানের এই সামরিক উত্থানের পেছনে রাশিয়া ও চীনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। রাশিয়ার সাথে তেহরানের ২০ বছরের কৌশলগত অংশীদারিত্বের চুক্তি তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে। রাশিয়ার সরবরাহকৃত ‘ভারবা’ ম্যানপ্যাড সিস্টেম এবং ‘এস-৪০০’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের আকাশসীমাকে অভেদ্য করে তুলেছে। অন্যদিকে, চীন সরাসরি অস্ত্র সরবরাহ না করলেও পশ্চিমা ডিজাইনের ইঞ্জিনের নকশা ও উচ্চপ্রযুক্তির খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পকে সচল রাখছে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে মার্কিন বা জার্মান নকশার আদলে তৈরি উন্নত ড্রোন ও ক্রুজ মিসাইল ব্যবহার করে ইরান এখন খোদ যুক্তরাষ্ট্রকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিলে দুই-তিন দিনেই এই যুদ্ধের অবসান ঘটবে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। ইরান কেবল আকাশপথে নয়, সমুদ্রপথেও ‘অ্যা対称িক ওয়ারফেয়ার’ বা অপ্রতিসম যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে তারা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরির সক্ষমতা রাখে। তাদের দ্রুতগামী অ্যাটাক বোট ও চীনা ডিজাইনের অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ মিসাইল মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ।
পরিশেষে বলা যায়, বছরের পর বছর ধরে চলা কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান যেভাবে রাশিয়ার হাত ধরে এবং পশ্চিমা প্রযুক্তির নকল তৈরি করে নিজেদের সুরক্ষিত করেছে, তা আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। মধ্যপ্রাচ্যের এই রণক্ষেত্রে এখন দেখার বিষয়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্রুত জয়ের রণকৌশল সফল হয়, নাকি ইরান তাদের আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এক দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী গেরিলা যুদ্ধের পথে হাঁটে।