খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 23শে অগ্রহায়ণ ১৪৩২ | ৭ই ডিসেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি বীমা করপোরেশন আইনের পুনর্বীমা-সংক্রান্ত ধারা বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্টে (এনডিএ) উল্লিখিত শর্তের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে জানা গেছে। এই ধারা বাতিল হলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সাধারণ বীমা করপোরেশনের (এসবিসি) ব্যবসা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে বলে প্রতিষ্ঠানটির মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পুনর্বীমা এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো বীমা কোম্পানি নিজেদের ঝুঁকি কমাতে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট প্রিমিয়ামের বিনিময়ে ঝুঁকির অংশ হস্তান্তর করে। বর্তমানে দেশের ৪৫টি বেসরকারি সাধারণ বীমা কোম্পানিকে তাদের মোট বীমা ঝুঁকির ৫০ শতাংশ এসবিসির সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে পুনর্বীমা করতে হয়। বাকি ৫০ শতাংশ পুনর্বীমা দেশীয় বা বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমে করার সুযোগ রয়েছে।
এই বাধ্যতামূলক ব্যবস্থায় এসবিসি উল্লেখযোগ্য আয় পায়, যা থেকে প্রতিষ্ঠানটি বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলোকেও অংশ হিসেবে অর্থ প্রদান করে। ফলে সরকারি ও বেসরকারি উভয় পক্ষই উপকৃত হয়। পাশাপাশি বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত সরকারি প্রকল্প ও সম্পত্তির পুনর্বীমাও বাধ্যতামূলকভাবে এসবিসির মাধ্যমে করতে হয়, যা প্রতিষ্ঠানটির আরেকটি বড় আয় উৎস। নতুন আইনের খসড়ায় এটিও বাতিল বা শিথিল করার প্রস্তাব রয়েছে।
এসবিসির কর্মকর্তারা জানান, এই ধারা বিলোপ হলে বিদেশি বীমা কোম্পানির ব্যবসা বাড়বে, কারণ তারা বাংলাদেশের বড় প্রকল্পে সরাসরি প্রবেশ করতে পারবে। তাদের মতে, বিদেশি, বিশেষ করে পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর জন্য বাজার উন্মুক্ত করতেই যুক্তরাষ্ট্র এই শর্ত দিয়েছে।
১১ নভেম্বর এসবিসি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে একটি চিঠি পাঠিয়ে উদ্বেগ জানায়। সেখানে উল্লেখ করা হয় যে, বাধ্যতামূলক পুনর্বীমা তুলে দিলে দেশীয় কোম্পানিগুলো বিদেশে ইচ্ছামতো পুনর্বীমা করতে পারবে, যার ফলে দেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা বেরিয়ে যাবে এবং পুনর্বীমা প্রিমিয়াম প্রদানের আড়ালে মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকিও তৈরি হবে।
এসবিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ গণমাধ্যমে বলেন, আইন পরিবর্তন হলে দীর্ঘমেয়াদে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হবে।
| বছর | পুনর্বীমা প্রিমিয়াম আয় | গড় বাৎসরিক কর-পূর্ব মুনাফা |
|---|---|---|
| ২০২৪ | ১,১২২ কোটি টাকা | ৪০০ কোটি টাকা |
সরকার ইতোমধ্যে বীমা করপোরেশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, যার খসড়া প্রস্তুত করেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। খসড়াটি কয়েক দফা মতামত বিনিময়ের পর চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
বাণিজ্য সচিব মহবুবুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, আমেরিকার সঙ্গে এনডিএ-তে বীমা আইন সংশোধনের বিষয়টি থাকলেও আগে থেকেই সরকারের আইন পরিবর্তনের উদ্যোগ ছিল। তাই একে পুরোপুরি এনডিএ শর্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করা সঠিক হবে না।
এনডিএ-র ‘সার্ভিসেস’ অংশে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ বাধ্যতামূলক পুনর্বীমা ব্যবস্থা বাতিল করবে। এর ফলে ৫০ শতাংশ অংশ এসবিসির কাছে রাখার বাধ্যবাধকতাও থাকবে না।
এসবিসি দাবি করে, তারা সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মালিকানা হওয়ায় আন্তর্জাতিক মানের চেয়েও বেশি সুরক্ষা প্রদান করতে পারে, ফলে বিদেশি প্রকল্পের পুনর্বীমায় আন্তর্জাতিক রেটিংয়ের শর্ত অপ্রয়োজনীয়। প্রস্তাব কার্যকর হলে এসব প্রকল্পের সব প্রিমিয়াম বিদেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও বীমা বিভাগের অধ্যাপক ড. মঈন উদ্দিন বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি গ্রাহকের আস্থা তুলনামূলক বেশি। বেসরকারি অনেক কোম্পানির দাবি পরিশোধের ক্ষমতা সীমিত। তাই আইন পুরোপুরি উন্মুক্ত করা উচিত নয়। কিছু অংশ বাধ্যতামূলক থাকা প্রয়োজন।
খবরওয়ালা/এএসএন