রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে পড়ে যাওয়া একটি যাত্রীবাহী বাস প্রায় আড়াই ঘণ্টার উদ্ধার অভিযানের পর নদী থেকে তোলা হয়েছে। শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ বাসটিকে উদ্ধার করে ঘাটে থাকা কে-টাইপ ফেরি ‘করবী’র ওপর নিয়ে আসে। দুর্ঘটনাটি বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি করলেও সৌভাগ্যবশত কোনো যাত্রী বাসে না থাকায় হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
সকালে প্রায় ৯টা ৪০ মিনিটে এসবি সুপার ডিলাক্স পরিবহনের বাসটি দৌলতদিয়ার ৭ নম্বর ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেরির র্যাম ভেঙে সরাসরি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটে যে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বাসটি নদীর পানিতে তলিয়ে যেতে শুরু করে। তবে তার আগেই ফেরিতে ওঠার নিয়ম অনুসারে সব যাত্রীকে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে একটি সম্ভাব্য ভয়াবহ দুর্ঘটনা বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নেয়নি।
দুর্ঘটনার পরপরই বাসের চালক ঝন্টু আলী এবং তাঁর সহকারীকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় চালক জানান, কুষ্টিয়ার মদনপুর থেকে প্রায় ৩৭ জন যাত্রী নিয়ে বাসটি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। দৌলতদিয়া ঘাটে পৌঁছানোর পর নিয়ম অনুযায়ী যাত্রীদের বাস থেকে নামতে বলা হয়। এরপর ফেরিতে ওঠার সময় হঠাৎ বাসটির ব্রেক কাজ করা বন্ধ করে দেয় বলে তিনি দাবি করেন। ফলে বাসটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে ফেরির র্যামে আঘাত হানে এবং নদীতে পড়ে যায়।
একজন যাত্রী, যিনি পেশায় শিক্ষক, জানান যে তিনি প্রথমে বাস থেকে নামতে অনিচ্ছুক ছিলেন। কিন্তু নৌ পুলিশের কঠোর তৎপরতায় তাঁকে এবং অন্য যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়া হয়। কয়েক মুহূর্ত পরই বাসটি নদীতে পড়ে যায়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তই বহু মানুষের জীবন রক্ষা করেছে।
দুর্ঘটনার সংক্ষিপ্ত তথ্য
বিষয়
তথ্য
দুর্ঘটনার স্থান
দৌলতদিয়া ৭ নম্বর ফেরিঘাট, গোয়ালন্দ, রাজবাড়ী
দুর্ঘটনার সময়
শুক্রবার সকাল ৯:৪০ মিনিট
পরিবহন
এসবি সুপার ডিলাক্স
যাত্রীর সংখ্যা
প্রায় ৩৭ জন
মোট আরোহী
প্রায় ৪০ জন
দুর্ঘটনার ধরন
ফেরিতে ওঠার সময় বাস নদীতে পড়ে যায়
সম্ভাব্য কারণ
ব্রেক বিকল হয়ে নিয়ন্ত্রণ হারানো
আহত
চালক ও সহকারী
নিহত
কেউ নয়
উদ্ধার সময়
প্রায় আড়াই ঘণ্টা পরে
দৌলতদিয়া ফেরিঘাট দেশের অন্যতম ব্যস্ত নৌ-যোগাযোগ কেন্দ্র। প্রতিদিন শত শত বাস, ট্রাক, পণ্যবাহী যান এবং হাজারো যাত্রী এই ঘাট ব্যবহার করে। ফলে ফেরিতে যানবাহন ওঠানামার সময় নিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, যাত্রীদের বাস থেকে নামিয়ে দেওয়ার নিয়ম দীর্ঘদিন ধরেই কার্যকর রয়েছে এবং এ ধরনের দুর্ঘটনায় তা জীবনরক্ষাকারী ভূমিকা পালন করে।
উল্লেখ্য, একই ঘাটে চলতি বছরের ২৫ মার্চ একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনায় কুষ্টিয়া থেকে আসা একটি যাত্রীবাহী বাস নদীতে পড়ে যায় এবং ২৬ জন যাত্রীর মৃত্যু ঘটে। সেই ঘটনার স্মৃতি এখনও মানুষের মনে তাজা। ফলে শুক্রবারের ঘটনায় প্রাণহানি না হওয়াকে অনেকেই বড় স্বস্তি হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার সময় বাসটিতে কোনো যাত্রী না থাকায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বাসে থাকা যাত্রীদের মালামাল শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় প্রমাণ যাচাইয়ের মাধ্যমে মালিকদের কাছে ফেরত দেওয়া হবে।
রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন বলেন, নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলার কারণেই এদিন বহু মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে পাঁচ থেকে সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং ফেরিঘাটের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও পর্যালোচনা করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল যে ফেরিঘাটে যাত্রী নামিয়ে যানবাহন পারাপারের নিয়ম কেবল প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি বহু মানুষের জীবন রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।