একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়া এবং অন্যতম বাদী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর (৮৭) মরদেহ দাফন ঘিরে চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতাকর্মীদের তীব্র বিরোধিতা ও বাধার কারণে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তার মরদেহ পিরোজপুর পুলিশ লাইনসের ভেতরে একটি ফ্রিজিং গাড়িতে রাখা হয়েছে।
শনিবার সকাল ১০টার দিকে গোপালগঞ্জের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মানিক পশারী শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। তিনি পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিরাপত্তা ও সার্বিক পরিস্থিতিতে তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় তার মেয়ে এবং জামাতার আশ্রয়ে ছিলেন।
মরদেহের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা বা গার্ড অব অনার প্রদান এবং জানাজা অনুষ্ঠান ঘিরে সকাল থেকেই নানা ঘটনা ঘটতে থাকে। মৃত মুক্তিযোদ্ধার জামাতা ফারুক হোসেনের তথ্যমতে, মৃত্যুর পর দুপুর ১২টার দিকে তারা মরদেহ নিয়ে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে পৌঁছান। প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়ার কথা জানিয়ে পরিবারকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে বলা হয়।
পরিবারের অভিযোগ, জামায়াতের স্থানীয় নেতাদের বিরোধিতার কারণে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদানের প্রক্রিয়া থমকে যায়। একজন গেজেটভুক্ত প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধার লাশ সাধারণ অ্যাম্বুল্যান্সে বরফ ছাড়া দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টা ফেলে রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে বিকেল পাঁচটার দিকে কোনোমতে পুলিশ লাইনসের ভেতরের প্রাঙ্গণে গোপনে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। তবে এতে দাফন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। প্রশাসন দাফনের বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট ব্যবস্থা না নেয়ায় পরিবারের সদস্যরা চরম উদ্বেগ ও হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন।
অন্যদিকে, পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক প্রকাশ্যে সংবাদ মাধ্যমকে জানান, মানিক পশারীকে তারা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিবেচনা করেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার অবস্থান ব্যবহার করা হয়েছে। তাই পিরোজপুরের মাটিতে তাকে কোনোভাবেই দাফন করতে দেওয়া হবে না বলে হুশিয়ারি দেন তিনি। দলীয় অবস্থান স্পষ্ট করে পুলিশ লাইনসের বাইরে অবস্থান নেন জামায়াতের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসন মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিয়েছে। পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম রাত ১০টার দিকে জানান, লাশ সুরক্ষার স্বার্থে এবং অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ লাইনসে ফ্রিজিং গাড়িতে রাখা হয়েছে। মানিক পশারীকে তার নিজ গ্রামের বাড়িতে নিরাপদে দাফন করার ব্যাপারে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধ্যমতো চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, রাজনৈতিক অভিভাবক ও জামায়াতের দায়িত্বশীল নেতাদের সাথে সমন্বয় ও কথা বলে সার্বিক সমস্যার সম্মানজনক সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।


