খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 26শে মাঘ ১৪৩২ | ৮ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
যুদ্ধ মানেই ধ্বংস, বিচ্ছেদ আর প্রিয়জনকে হারানোর চিরস্থায়ী হাহাকার। কিন্তু চলমান ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ঘনঘোর অন্ধকারের মাঝে এক অবিশ্বাস্য আশার আলো হয়ে ফিরে এলেন ইউক্রেনীয় সেনাসদস্য নাজার দালিটস্কি। যাকে দুই বছর আগে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘মৃত’ ঘোষণা করা হয়েছিল এবং পরিবারের সদস্যরা যার ‘মরদেহ’ সৎকার করেছিলেন, সেই নাজারই সম্প্রতি রুশ বন্দিশালা থেকে মুক্তি পেয়ে মাকে ফোন করেছেন। এই অলৌকিক ঘটনাটি কেবল একটি পরিবারের আনন্দ নয়, বরং ইউক্রেনের হাজারো নিখোঁজ সেনার পরিবারের কাছে এক নতুন আশার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২২ সালে রাশিয়া যখন ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় আক্রমণ শুরু করে, তখন ৪২ বছর বয়সী অভিজ্ঞ সেনাসদস্য নাজার দালিটস্কি দেশ রক্ষায় রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এর আগেও ২০১৪ সালে তিনি যুদ্ধের ময়দানে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে যুদ্ধের প্রথম বছর অর্থাৎ ২০২২ সালের মে মাসে রণক্ষেত্র থেকে নাজার হঠাৎ নিখোঁজ হন। দীর্ঘ সময় কোনো খবর না পেয়ে এবং ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ দক্ষিণ-পূর্ব ইউক্রেনের একটি মর্গে রাখা একটি মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়া মরদেহকে নাজার হিসেবে শনাক্ত করে। একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত বাসের ভেতর থেকে উদ্ধার হওয়া সেই মৃতদেহটিই নাজার ভেবে ২০২৩ সালে তাঁর নিজ গ্রামে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় সমাহিত করা হয়েছিল।
মৃত সন্তানের কবরে শোকাতুর নাতালিয়া দালিটস্কি (নাজারের মা) দীর্ঘ দুই বছর যাপন করেছেন অন্তহীন শূন্যতায়। কিন্তু গত সেপ্টেম্বরে রুশ বন্দিশালা থেকে মুক্তি পাওয়া এক সহযোদ্ধার মাধ্যমে প্রথম খবর আসে যে নাজার বেঁচে আছেন। অবশেষে চলতি সপ্তাহে সরাসরি নাজারের ফোনকল পান নাতালিয়া। ফোনে নাজার জানান, দীর্ঘ প্রায় চার বছর (৩ বছর ৯ মাস) তিনি রাশিয়ার কারাগারে বন্দি ছিলেন। শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল ও ক্লান্ত হলেও তিনি ইউক্রেনের মাটিতে পা রেখেছেন।
| সময়কাল | ঘটনাপ্রবাহ |
| ফেব্রুয়ারি ২০২২ | রাশিয়ার আক্রমণ শুরুর পর যুদ্ধে যোগদান। |
| মে ২০২২ | রণক্ষেত্র থেকে নিখোঁজ হওয়া। |
| ২০২৩ | পুড়ে যাওয়া মরদেহ শনাক্তকরণ ও রাষ্ট্রীয়ভাবে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। |
| সেপ্টেম্বর ২০২৫ | সহযোদ্ধার মাধ্যমে বেঁচে থাকার খবর প্রথম প্রাপ্তি। |
| ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | বন্দিবিনিময়ের আওতায় মুক্তি ও মাকে প্রথম ফোন। |
| বর্তমান অবস্থা | শারীরিকভাবে দুর্বল হলেও ইউক্রেনের নিরাপদ আশ্রয়ে চিকিৎসাধীন। |
কিভাবে একজন জীবন্ত মানুষের বদলে অন্য কারো মরদেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হলো, তা নিয়ে বর্তমানে তদন্ত শুরু হয়েছে। গ্রামে ‘নিহত বীরদের’ প্রদর্শনী থেকে নাজারের ছবি নামিয়ে ফেলা হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে তাঁর শেষকৃত্যের শোকবার্তাগুলো মুছে ফেলছে পরিবার, যাতে ফিরে এসে নাজার মানসিকভাবে কষ্ট না পান।
ইউক্রেনের বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৭০ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের বড় একটি অংশই সেনাসদস্য। নাজারের এই ফিরে আসা প্রমাণ করে যে, যুদ্ধক্ষেত্রের বিশৃঙ্খলায় ডিএনএ বা ফরেনসিক রিপোর্টও সবসময় নিখুঁত হয় না।
নাজারের মা নাতালিয়া এখন তাঁর ছেলের প্রিয় খাবারগুলো রান্না করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, “একজন মা হিসেবে আমি যে আনন্দ অনুভব করছি, তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। আমি চাই সব নিখোঁজ সেনার মায়েরাও যেন একদিন এমন একটি ফোনকল পান।” নাজারের এই ফিরে আসা কেবল একটি পরিবারের পুনর্মিলন নয়, এটি যুদ্ধের বিভীষিকার বিরুদ্ধে জীবনের এক পরম জয়।