খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
আমেরিকার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আবেগঘন এবং নাটকীয় অধ্যায়গুলোর অন্যতম নীরব সাক্ষী। প্রায় এক দশক আগে এই মাঠেই কোপা আমেরিকার শতবর্ষী আসরের ফাইনালে চিলির বিপক্ষে শিরোপা হাতছাড়া করে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। সময়ের চক্রে সেই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই আবারও অশ্রুসিক্ত হতে দেখা গেল এলএমটেন-কে। এবার মাঠের আবেগের প্রেক্ষাপট ও পারিপার্শ্বিকতা ভিন্ন হলেও, অনুভূতির গভীরতা যেন ঠিক এক দশক আগের মতোই প্রগাঢ়।
ফুটবলপ্রেমীদের কাছে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের নাম এলেই ২০১৬ সালের ২৬ জুনের সেই বেদনাময় স্মৃতির কথা মনে পড়ে যায়। কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির বিপক্ষে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা গোলশূন্য থাকার পর ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে পেনাল্টি শুট-আউটে নিজের শটটি জালের বাইরে মারেন মেসি। সেই চরম ব্যর্থতায় টানা দ্বিতীয়বারের মতো চিলির কাছে কোপার শিরোপা হারায় আর্জেন্টিনা। ম্যাচ শেষে মাঠের মধ্যেই কান্নায় ভেঙে পড়েন ফুটবল জাদুকর। সেই রাতেই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের আকস্মিক ঘোষণা দিয়ে বসেন তিনি। চোখের জল মুছতে মুছতেই বলেছিলেন, দেশের হয়ে তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন, কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে শিরোপা জেতা হয়তো তাঁর ভাগ্যে নেই।
এর আগে ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ এবং ২০১৫ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে জার্মানি ও চিলির কাছে পরাজয়ের তীব্র তিক্ততা সইতে হয়েছিল মেসিকে। টানা তিনটি বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে উঠেও ব্যর্থ হওয়ার পর আর্জেন্টিনার ফুটবল অনুরাগী ও সংবাদমাধ্যমের একাংশ তাঁর দেশপ্রেম এবং নেতৃত্ব নিয়ে কঠোর প্রশ্ন তুলেছিল। সমালোচনা আর সীমাহীন হতাশার সেই কালিমাময় সময়টাতে মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলেন মেসি। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে কোপা ফাইনালের পর নেওয়া অবসরের সিদ্ধান্তটি ছিল মূলত সেই জমে থাকা পুঞ্জীভূত কষ্ট ও অপমানেরই বহিঃপ্রকাশ।
অবশ্য কোটি ভক্তের প্রার্থনায় সেই বিদায় দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। দেশের আপামর মানুষের ব্যাকুল অনুরোধ, সতীর্থদের আন্তরিক আহ্বান এবং নিজের ভেতরের অদম্য ফুটবল ক্ষুধার কারণে অবসরের সিদ্ধান্ত বদলে মাত্র কয়েক মাস পরেই জাতীয় দলে ফিরে আসেন মেসি। এরপরের গল্পটা কেবলই রূপকথার মতো ইতিহাস বদলে দেওয়ার। ২০২১ সালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে তাদেরই মাটিতে হারিয়ে দীর্ঘ ২৮ বছরের আন্তর্জাতিক শিরোপাখরা কাটায় আর্জেন্টিনা। মেসির হাত ধরেই আসে কোপা আমেরিকার ট্রফি। এরপর ২০২২ সালে কাতারের মাটিতে অধরা বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন তিনি। ফিনালিসিমা এবং পরবর্তীতে আরও একটি কোপা জিতে দেশের ফুটবলের ইতিহাসে নিজেকে সবচেয়ে সফল ও মহানায়ক অধিনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি।
মেটলাইফ স্টেডিয়াম শুধু মেসির বেদনার স্মৃতিই বহন করে না, এই মাঠের ঘাসে মিশে আছে তাঁর উজ্জ্বল সাফল্যের গল্পও। ২০১২ সালে এই মাঠেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের বিপক্ষে এক আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করেছিলেন তিনি। ফুটবলপ্রেমীদের মনে আজও দাগ কেটে থাকা সেই রোমাঞ্চকর ম্যাচে ৪–৩ গোলে জিতেছিল আর্জেন্টিনা। সব মিলিয়ে মেটলাইফের মাঠে পাঁচটি ম্যাচ খেলে চারটি গোল করেছেন মেসি। তাই এই স্টেডিয়াম বিশ্বফুটবলের এই মহাতারকার কাছে যেমন সীমাহীন কষ্টের, তেমনি বাঁধভাঙা আনন্দেরও এক বিশেষ ঐতিহাসিক ঠিকানা।
ফুটবল ইতিহাসের প্রায় সব রেকর্ড নিজের করে নেওয়া মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার এখন একদম শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছে। নিজের বুট জোড়া তুলে রাখার বিষয়ে তিনি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সময়সীমা না জানালেও, আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা জার্সিতে তাঁর প্রতিটি ম্যাচই এখন ভক্তদের কাছে বাড়তি আবেগের কোটা তৈরি করে। বিশেষ করে মেটলাইফের মতো এমন স্মৃতিবিজড়িত ও পুরোনো ক্ষতে ভরা মাঠে তাঁকে আবারও চোখের জল ফেলতে দেখে ফুটবল বিশ্বের কোটি সমর্থকের মনে ফিরে এসেছে এক দশক আগের সেই চিরচেনা দৃশ্য।
তবে সময়ের ব্যবধানে সবচেয়ে বড় পার্থক্য ও প্রাপ্তি এখন এখানেই দৃশ্যমান। একসময় যে মেসি নিজেকে দেশের জার্সিতে ব্যর্থ মনে করে জাতীয় দল ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন, আজ সেই তিনিই বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকা জয় করে আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় ও সফলতম অধিনায়ক। তাই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আবারও তাঁর চোখ ভিজলেও, এবার সেই অপূর্ণতার বিষাদমাখা অশ্রুর পাশে বীরের মতো দাঁড়িয়ে আছে ক্যারিয়ার পূর্ণতার এক অনন্য ও মহিমান্বিত গল্প।