খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 21শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ৫ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে, তখন তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থায় দ্রুত ধস নামানো। কিন্তু যুদ্ধের পঞ্চম দিনে এসে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সেই ‘শক অ্যান্ড অউ’ (আকস্মিক ও প্রচণ্ড আঘাত) কৌশলটি প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ায় এখন তারা নতুন করে হিসাব মেলাতে বসছে। পেন্টাগন এবং হোয়াইট হাউস থেকে আসা সাম্প্রতিক বার্তাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত ইরানের এক সুপরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছে।
অভিযান শুরুর আগে পশ্চিমা গোয়েন্দাদের ধারণা ছিল, শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর হামলা হলে ইরানে ব্যাপক জনরোষ তৈরি হবে এবং শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পরও দেশটির প্রশাসনিক ও সামরিক কাঠামো বেশ স্থিতিশীল। উল্টো ইরান এখন ‘অ্যাট্রিশন ওয়ার’ বা ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের কৌশল গ্রহণ করেছে, যার লক্ষ্য হলো শত্রুপক্ষকে ক্লান্ত করে দেওয়া এবং যুদ্ধের ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া।
মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বক্তব্যে এখন সুর বদলেছে। তারা স্বীকার করছেন যে, এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং এতে ‘অতিরিক্ত প্রাণহানি’র আশঙ্কা রয়েছে। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে স্থল অভিযানের দাবি জানালেও, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এখনই সেই পথে হাঁটছে না। বরং তারা ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সম্পূর্ণ নির্মূল করার ওপর জোর দিচ্ছে।
| খাতের বিবরণ | বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রভাব |
| মার্কিন ঘাঁটি | মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ১১টি স্থাপনায় ইরান আঘাত হেনেছে। |
| জ্বালানি বাজার | তেলের দাম আকাশচুম্বী; সৌদি ও কাতারি শোধনাগারে অস্থিরতা। |
| কৌশলগত পরিবর্তন | ইসরায়েলের ওপর বড় হামলার বদলে পুরো অঞ্চলে হামলা ছড়িয়ে দেওয়া। |
| অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি | বিদ্রোহের পরিবর্তে সামরিক ইউনিটগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি। |
| আঞ্চলিক কূটনীতি | উপসাগরীয় দেশগুলো (আমিরাত, কাতার) নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। |
ইরানের বর্তমান কৌশলের নাম দেওয়া যেতে পারে ‘যুদ্ধব্যয় ভাগ করে দেওয়া’। তেহরান বুঝতে পেরেছে যে কেবল ইসরায়েলকে আঘাত করে এই যুদ্ধে জেতা সম্ভব নয়। তাই তারা মার্কিন মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার ইতিমধ্যে তাদের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের মজুত ফুরিয়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ইরান সরাসরি হুমকি দিয়েছে যে, তাদের ওপর হামলার জন্য যদি কোনো দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করা হয়, তবে সেই দেশকেও চড়া মূল্য দিতে হবে।
এর পাশাপাশি, ইরান হরমুজ প্রণালি ও সামুদ্রিক বাণিজ্যকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটিয়ে তারা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আঘাত হানতে চায়। তেলের দাম বাড়লে ওয়াশিংটনের ওপর যে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হবে, তাকেই ইরান দরকষাকষির প্রধান অস্ত্র হিসেবে দেখছে।
সরাসরি সামরিক সাফল্যে ঘাটতি দেখে যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের ভেতরে জাতিগত সংখ্যালঘু যেমন—কুর্দি, আজেরি ও বালুচদের ব্যবহার করে গৃহযুদ্ধ বা অস্থিতিশীলতা তৈরির পরিকল্পনা করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কুর্দি নেতাদের সঙ্গে ফোনালাপ সেই ইঙ্গিতই দেয়। তবে ইরানও বসে নেই; তারা ইরাকের সীমান্ত এলাকায় কুর্দি ক্যাম্পগুলোতে আগাম হামলা চালিয়ে এই পরিকল্পনা নস্যাৎ করার চেষ্টা করছে।
বর্তমান সংঘাত কেবল ইরানের ভাগ্য নির্ধারণ করছে না, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের সহ্যক্ষমতার পরীক্ষা নিচ্ছে। ইরান সুপরিকল্পিতভাবে সময়ক্ষেপণ করছে এবং বহুমুখী চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে এক অন্তহীন যুদ্ধের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। পেন্টাগনের জন্য এখন বড় প্রশ্ন হলো—ইরানের এই ‘ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ’ মোকাবিলা করতে গিয়ে তারা কি চীনের বিরুদ্ধে তাদের দীর্ঘমেয়াদী এশীয় কৌশলকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে? যুদ্ধের এই ব্যয় ও ঝুঁকি শেষ পর্যন্ত কে বেশিদিন বইতে পারবে, তার ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ মানচিত্র।