খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬
ঢাকার সাভারের রানা প্লাজা ধসের ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ধ্বংসস্তূপের নিচে টানা তিন দিন আটকে থেকেও অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছিলেন দিনাজপুরের নাসিমা বেগম (৪০)। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, এক দশক পর পদ্মা নদীর আরেক ভয়াবহ নৌ-দুর্ঘটনায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে। ২৫ মার্চ রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় পদ্মা নদীতে একটি বাস ডুবে গেলে তিনি প্রাণ হারান। পরে তাঁর মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সও কুষ্টিয়ার কাছে দুর্ঘটনার শিকার হয়, যা এই করুণ ঘটনার শোককে আরও গভীর করে তোলে। শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে পার্বতীপুর উপজেলার আটরাই গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
নাসিমা বেগম ছিলেন দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার পলাশবাড়ী ইউনিয়নের আটরাই গ্রামের বাসিন্দা। জীবিকার তাগিদে একসময় ঢাকায় পোশাক কারখানায় কাজ করতেন তিনি। ২০১৩ সালের রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় তিনি গুরুতর আহত হলেও মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন। সেই সময়ের ট্রমা কাটিয়ে তিনি পরে গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসেন এবং জীবন সংগ্রামে আবারও যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ঈদ উপলক্ষে নাসিমা রাজবাড়ীতে তাঁর অন্তঃসত্ত্বা ভাগনি নাজমিরা খাতুনের (৩১) বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। ঈদের ছুটি শেষে তাঁরা একসঙ্গে ঢাকায় ফিরে কাজ শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু সেই যাত্রাই হয়ে দাঁড়ায় জীবনের শেষ যাত্রা। একই দুর্ঘটনায় নাজমিরা খাতুন ও তাঁর চার বছর বয়সী ছেলে আবদুর রহমানও প্রাণ হারান।
নাজমিরার পরিবারের সদস্য লিটন শেখ জানান, দুপুরের পর পরিবারের চার সদস্য একসঙ্গে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। ফেরিঘাট এলাকায় পৌঁছে বাসটি ফেরির অপেক্ষায় ছিল। কিছু সময়ের জন্য বাস থেকে নামার পর আবার সবাই ভেতরে ওঠেন। এরপর হঠাৎ বাসটি নদীতে পড়ে যায়। পানির স্রোতে বাসটি দ্রুত ডুবে গেলে কেউ আর বের হতে পারেননি। পরে উদ্ধারকর্মীরা রাতের দিকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেন।
নাসিমার জীবন ছিল সংগ্রাম ও বেঁচে থাকার লড়াইয়ের এক দীর্ঘ অধ্যায়। দুই বছর বয়সে তিনি পিতামাতার বিচ্ছেদ দেখেন, পরে জীবিকার জন্য ঢাকায় পাড়ি জমান। আট বছর আগে দ্বিতীয় বিয়ে করেন, কিন্তু সাত মাস আগে স্বামী নুর ইসলামের মৃত্যু তাঁর জীবনকে আবারও বিপর্যস্ত করে তোলে। এর মধ্যেই তিনি কর্মসংস্থানের খোঁজে নতুন করে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
| সময়/পর্যায় | ঘটনা |
|---|---|
| ২০১৩ | রানা প্লাজা ধসে ধ্বংসস্তূপে তিন দিন আটকে থেকে বেঁচে যান নাসিমা |
| ঈদের আগে | নাসিমা রাজবাড়ীতে ভাগনির বাড়িতে বেড়াতে যান |
| ২৫ মার্চ | দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় বাস পদ্মা নদীতে ডুবে তিনজনের মৃত্যু |
| ঘটনার পর | মরদেহ উদ্ধার ও অ্যাম্বুলেন্স দুর্ঘটনা |
| শুক্রবার | পার্বতীপুরের আটরাই গ্রামে দাফন সম্পন্ন |
পার্বতীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাদ্দাম হোসেন জানান, নাসিমার পরিবারকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। তবে এই সহায়তা পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি ও শোক পূরণ করতে পারবে না।
নাসিমার জীবন যেন একের পর এক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে রইল—যেখানে একবার মৃত্যুকে জয় করেও শেষ পর্যন্ত তিনি প্রকৃতির নির্মম পরিণতি থেকে রক্ষা পাননি।