স্প্যানিশ ফুটবল ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের সভাপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী এনরিক রিকুয়েলমেকে পরাজিত করে পুনরায় নির্বাচিত হয়েছেন ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ। রোববার ক্লাবের স্পোর্টস সিটি ভালদেবেবাসে এই বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল অনুযায়ী, পেরেজ আগামী চার বছরের জন্য ক্লাবটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন, যার মেয়াদকাল শেষ হবে ২০৩০ সালে।
নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও ভোটের পরিসংখ্যান
রোববার ভালদেবেবাসে দিনব্যাপী ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। নির্বাচনের শুরু থেকেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং বুথফেরত জরিপে (এক্সিট পোল) পেরেজের এগিয়ে থাকার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল। চূড়ান্ত ভোট গণনায় দেখা যায়, পেরেজ মোট ২১ হাজার ৭৪১টি ভোট পেয়েছেন, যা কাস্ট হওয়া মোট বৈধ ভোটের প্রায় ৬৫ শতাংশ।
অন্যদিকে, তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী এনরিক রিকুয়েলমে পেয়েছেন ১১ হাজার ৮১৪টি ভোট, যা মোট ভোটের ৩৫ শতাংশ। এর ফলে বড় ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে পেরেজ আরও এক মেয়াদের জন্য সভাপতি পদটি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হন।
পেরেজের নির্বাচনী ইতিহাস ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
২০০০ সাল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত রিয়াল মাদ্রিদের অধিকাংশ সময়জুড়েই সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ। মাঝখানে কেবল ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিন বছর তিনি এই দায়িত্বের বাইরে ছিলেন।
পেরেজের নির্বাচনী ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়:
-
১৯৯৫ সাল: তিনি প্রথমবারের মতো রিয়াল মাদ্রিদের সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তবে তৎকালীন সভাপতি র্যামন মেন্দোজার কাছে পরাজিত হন।
-
২০০০ সাল: লরেনৎসো সানজকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো রিয়ালের সভাপতি নির্বাচিত হন পেরেজ। সে সময় তিনি ৫৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন, যেখানে ডাকযোগের ভোট (পোস্টাল ব্যালট) জয়ের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
-
২০০৪ সাল: দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনে তিনি ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে একচেটিয়া সমর্থনসহ বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করেন।
-
২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল: ২০০৯ সালে সাবেক সভাপতি র্যামন ক্যালদেরনের বিতর্কিত বিদায়ের পর পেরেজ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর ২০১৩, ২০১৭, ২০২১ এবং ২০২৫ সালের নির্বাচনী প্রক্রিয়াগুলোতে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় তাঁকে কোনো আনুষ্ঠানিক ভোটের মুখোমুখি হতে হয়নি।
ফলে ২০০৯ সালে ক্লাবের নেতৃত্বে ফেরার পর থেকে দীর্ঘ সময় পর এবারের নির্বাচনটিই ছিল পেরেজের জন্য প্রথম প্রকৃত এবং সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটের লড়াই।
নির্বাচনী আবহ ও তাৎক্ষণিক প্রেক্ষাপট
নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতে পেরেজ এবং রিকুয়েলমের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের পরিবেশ বজায় থাকলেও সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের পাশাপাশি নির্বাচিত হলে ক্লাবে ‘কোন বিশ্বমানের তারকা খেলোয়াড়কে চুক্তিবদ্ধ করা হবে’—এমন পরিচিত ফুটবল-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা তীব্র আকার ধারণ করে। তবে শেষ পর্যন্ত ভোটাররা পেরেজের অভিজ্ঞতার ওপরই আস্থা রাখেন।
উল্লেখ্য, পেরেজের বর্তমান মেয়াদের সময়সীমা ২০২৯ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মাঠের ভেতরে ক্লাবের আশানুরূপ পারফরম্যান্স না হওয়া এবং মাঠের বাইরে ক্লাবের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে পেরেজ প্রায় এক মাস আগে, ১২ মে আকস্মিকভাবে এই আগাম নির্বাচন দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।
ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের রিয়াল মাদ্রিদ নির্বাচনী ইতিহাস
নিচে ১৯৯৫ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত রিয়াল মাদ্রিদের সভাপতি নির্বাচনে ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের অংশগ্রহণ ও ভোটের পরিসংখ্যানগত তুলনামূলক চিত্র উপস্থাপন করা হলো:
| নির্বাচনের বছর | প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী | পেরেজের প্রাপ্ত ভোট (%) | নির্বাচনী ফলাফল | বিশেষ মন্তব্য |
| ১৯৯৫ | র্যামন মেন্দোজা | পরাজিত | মেন্দোজার কাছে প্রথম পরাজয় | প্রথমবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ |
| ২০০০ | লরেনৎসো সানজ | ৫৫% | বিজয়ী | প্রথমবার দায়িত্ব গ্রহণ; ডাকযোগের ভোট গুরুত্বপূর্ণ ছিল |
| ২০০৪ | — | ৯০%+ | বিজয়ী | একচেটিয়া ও রেকর্ডসংখ্যক সমর্থন লাভ |
| ২০০৯ | কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না | বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় | বিজয়ী | র্যামন ক্যালদেরনের বিদায়ের পর পুনরায় প্রত্যাবর্তন |
| ২০১৩ | কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না | বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় | বিজয়ী | স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেয়াদ বৃদ্ধি |
| ২০১৭ | কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না | বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় | বিজয়ী | স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেয়াদ বৃদ্ধি |
| ২০২১ | কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না | বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় | বিজয়ী | স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেয়াদ বৃদ্ধি |
| ২০২৫ | কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না | বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় | বিজয়ী | স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেয়াদ বৃদ্ধি |
| ২০২৬ (বর্তমান) | এনরিক রিকুয়েলমে | ৬৫% (২১,৭৪১ ভোট) | বিজয়ী | ২০৩০ সাল পর্যন্ত মেয়াদ; ১৭ বছর পর প্রথম সরাসরি ভোট |
ভোটের এই রায় রিয়াল মাদ্রিদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের অবস্থানকে আরও সুসংহত করল এবং ক্লাবটির ভবিষ্যৎ পরিচালনা ও উন্নয়ন পরিকল্পনার নিয়ন্ত্রণ ২০৩০ সাল পর্যন্ত তাঁর হাতেই ন্যস্ত রইল।



