শিক্ষার মান অবনতিশীল, ফি বাড়ছে লাগামছাড়া

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। হাতে গোনা কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বিপুলসংখ্যক উচ্চশিক্ষাপ্রত্যাশীর চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছিল। ফলে অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য ভারতসহ ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাতেন। এতে একদিকে মেধাপাচার, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় ঘটত। এ বাস্তবতা বিবেচনায় ১৯৯২ সালে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেওয়া হয়। তিন দশকের ব্যবধানে বর্তমানে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১৭টিতে।

সংখ্যা বৃদ্ধির এই প্রবণতা উচ্চশিক্ষার প্রসার ঘটালেও গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট, পর্যাপ্ত ল্যাব-লাইব্রেরির অভাব, স্থায়ী ক্যাম্পাসের অনুপস্থিতি এবং গবেষণা পরিবেশের ঘাটতি রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ভাড়া ভবনে সীমিত অবকাঠামো নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কোথাও কোথাও একটি বিভাগে মাত্র দু-একজন প্রভাষক দিয়ে পাঠদান চলছে। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিখন-ঘাটতি থেকে যাচ্ছে এবং কর্মবাজারে তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে এ ঘাটতি একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

নিচে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাধারণ চিত্র সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—

বিষয় বর্তমান অবস্থা প্রভাব
মোট সংখ্যা ১১৭ উচ্চশিক্ষার বিস্তার, তবে মান নিয়ে প্রশ্ন
শিক্ষকসংকট বহু প্রতিষ্ঠানে শিখন-ঘাটতি, দুর্বল একাডেমিক ফলাফল
অবকাঠামো ল্যাব, লাইব্রেরি, হলের অভাব মানসম্মত শিক্ষা ব্যাহত
কারিকুলাম অনেক ক্ষেত্রে অনুপযোগী বা প্রয়োগহীন দক্ষতা উন্নয়নে বাধা
ফি কাঠামো অস্বাভাবিক উচ্চ শিক্ষার্থীদের আর্থিক চাপ

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় ট্রাস্টি বোর্ডের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগ, পাঠ্যক্রম নির্ধারণ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই তাদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। কিন্তু বহু প্রতিষ্ঠানে ট্রাস্টি বোর্ডে দ্বন্দ্ব, অনিয়ম ও আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে।

সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো টিউশন ফি। আইন অনুযায়ী দেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় ফি নির্ধারণের কথা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের ইচ্ছামতো ফি বাড়াচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে রাজধানীর একটি মধ্যমসারির বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগে প্রতি সেমিস্টারে প্রায় ৫৬ হাজার টাকা টিউশন ফি নেওয়া হয়। থাকা-খাওয়াসহ ছয় মাসে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার টাকা, বছরে প্রায় ২ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। অন্যদিকে ভারতের একটি মাঝারি মানের বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিভাগে সেমিস্টারপ্রতি ফি প্রায় ২০ হাজার রুপি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় আনুমানিক ৩০ হাজার টাকার সমপরিমাণ।

আরেক শিক্ষার্থীর তথ্য অনুযায়ী, একটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে পার ক্রেডিট ফি চার বছরে ৪ হাজার টাকা থেকে বেড়ে সাড়ে ৫ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে বছরে তিন সেমিস্টারে শুধু টিউশন ফিতেই ব্যয় হয় প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। থাকা-খাওয়া মিলিয়ে মোট ব্যয় সাড়ে ৩ লাখ টাকার বেশি।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ অনুযায়ী অর্থায়নের ছয়টি উৎস থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের ফি-নির্ভর। দান, অনুদান, গবেষণা আয় বা অন্যান্য উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ দেখা যায় না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্রমে লাভকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে।

উচ্চশিক্ষা কোনো পণ্য নয়; এটি একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা। মানোন্নয়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খাত দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের পরিবর্তে আর্থিক শোষণের ক্ষেত্র হয়ে উঠবে। এখন প্রয়োজন কার্যকর নজরদারি, সময়োপযোগী কারিকুলাম, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং যুক্তিসংগত ফি কাঠামো প্রণয়ন—যাতে উচ্চশিক্ষা হয় সবার জন্য মানসম্মত ও সহনীয়।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।