খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬
বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে যে ক’জন মহাপুরুষ তাঁদের অসামান্য প্রতিভা, সৃজনশীলতা ও মানবিক চেতনার মাধ্যমে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন, তাঁদের অগ্রগণ্য নাম শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। তিনি শুধু একজন চিত্রশিল্পীই নন, ছিলেন বাঙালির শিল্প-আত্মপরিচয়ের নির্মাতা, লোকজ ঐতিহ্যের অনুসন্ধানী এবং মানবতার শিল্পভাষ্যকার। তাঁর তুলির আঁচড়ে বাংলার মাটি, মানুষ, নদী, দুর্ভিক্ষ, সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ জীবন্ত হয়ে উঠেছিল।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ১৯১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর তৎকালীন কিশোরগঞ্জ মহকুমায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। ছোটবেলা থেকেই তিনি প্রকৃতি, নদী, গ্রামীণ জীবন ও মানুষের প্রতি গভীর আকর্ষণ অনুভব করতেন। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র নদ এবং তার আশপাশের জীবনচিত্র তাঁর শিল্পমানসে গভীর প্রভাব ফেলে।
চিত্রকলার প্রতি প্রবল অনুরাগ থেকেই ১৯৩৩ সালে তিনি ভর্তি হন কলকাতা সরকারি আর্ট স্কুল-এ। সেখানে তিনি পাঁচ বছর ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় শিল্পধারার ওপর শিক্ষা গ্রহণ করেন। ছাত্রজীবনেই তাঁর অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়।
১৯৩৮ সালে সর্বভারতীয় চিত্রকলা প্রদর্শনীতে তাঁর অঙ্কিত বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘ব্রহ্মপুত্র নদ’ স্বর্ণপদক অর্জন করে এবং তিনি শিল্পাঙ্গনে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।
১৯৪৩ সালের ভয়াবহ বঙ্গীয় দুর্ভিক্ষ তাঁর শিল্পীসত্তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। অনাহারে কাতর, মৃতপ্রায় মানুষের যে হৃদয়বিদারক দৃশ্য তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তা ফুটে ওঠে তাঁর বিখ্যাত ‘দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা’-য়। কালো কালি ও তুলি দিয়ে আঁকা এই ছবিগুলো শুধু শিল্পকর্ম নয়, বরং মানবসভ্যতার বিরুদ্ধে ক্ষুধা ও অবিচারের এক নির্মম দলিল।
এই দুর্ভিক্ষের ছবিগুলো তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয় এবং মানবতাবাদী শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
দেশভাগের পর তিনি ঢাকায় এসে শিল্পশিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর উদ্যোগেই ১৯৪৮ সালে পুরান ঢাকার জনসন রোডে প্রতিষ্ঠিত হয় গভর্নমেন্ট আর্ট ইনস্টিটিউট, যা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদ নামে পরিচিত।
তিনি ছিলেন এ প্রতিষ্ঠানের প্রথম শিক্ষক এবং ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর হাত ধরেই পূর্ববাংলায় প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার ভিত্তি সুদৃঢ় হয়।
লোকশিল্প ও ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগ
বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর ছিল গভীর ভালোবাসা। তাঁর আগ্রহ ও পরিকল্পনায় ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। একইসঙ্গে জয়নুল সংগ্রহশালা গড়ে তোলা হয় তাঁর শিল্পকর্ম সংরক্ষণের জন্য।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের চিত্রকর্মের সংখ্যা তিন হাজারেরও বেশি। তাঁর বিখ্যাত শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা (১৯৪৩)
নৌকা (১৯৫৭)
সংগ্রাম (১৯৫৯)
বীর মুক্তিযোদ্ধা (১৯৭১)
ম্যাডোনা
দীর্ঘ স্ক্রলচিত্র ‘নবান্ন’ (১৯৬৯)
দীর্ঘ স্ক্রলচিত্র ‘মনপুরা-৭০’ (১৯৭৪)
বিশেষ করে ‘নবান্ন’ ও ‘মনপুরা-৭০’ বাঙালির জীবন, সংগ্রাম ও প্রকৃতির এক অনন্য শিল্প-আখ্যান হিসেবে সমাদৃত।
বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৪ সালে তাঁকে জাতীয় অধ্যাপক উপাধিতে ভূষিত করে। তিনি ‘শিল্পাচার্য’ উপাধিতে ভূষিত হন তাঁর অসামান্য শিল্পসাধনা ও শিল্পশিক্ষায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ।
১৯৭৬ সালের ২৯ মে এই মহান শিল্পী মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর শিল্পচেতনা, মানবিকতা এবং বাংলার মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ আজও বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনাকে আলোকিত করে চলেছে।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ছিলেন এমন এক শিল্পী, যিনি শিল্পকে কেবল সৌন্দর্যের অনুশীলন হিসেবে দেখেননি; তিনি শিল্পকে মানুষের জীবন, দুঃখ, সংগ্রাম ও স্বপ্নের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর শিল্পকর্মে যেমন আছে বাংলার প্রকৃতির সৌন্দর্য, তেমনি আছে শোষিত মানুষের কান্না ও প্রতিবাদ।
বাংলার শিল্প-আকাশে তিনি এক অনির্বাণ দীপশিখা—যাঁর আলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুগে যুগে পথ দেখাবে।