সয়াবিন তেলের সরবরাহে টান, বাড়ছে বাজারের চাপ

বাজারে আবারও বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে চাহিদা অনুযায়ী এক, দুই ও পাঁচ লিটারের বোতল পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের বাজারেও। গত এক সপ্তাহে এসব তেলের দাম লিটারে ২ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

এর মধ্যেই নতুন করে বেড়েছে ফার্মের মুরগির ডিমের দাম। অন্যদিকে ব্রয়লার মুরগি ও বিভিন্ন ধরনের মাছের দামও বেশ কিছুদিন ধরে তুলনামূলক বেশি রয়েছে। ফলে রান্নার তেল থেকে শুরু করে দৈনন্দিন খাবারের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের বাড়তি দামে চাপে পড়েছেন সীমিত ও নিম্ন আয়ের মানুষ।

দোকানে প্রয়োজনের তুলনায় কম সয়াবিন তেল

খুচরা বিক্রেতাদের ভাষ্য, ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো আগের তুলনায় কম পরিমাণে বোতলজাত সয়াবিন তেল বাজারে ছাড়ছে। এর ফলে ডিলার ও সরবরাহকারীদের কাছ থেকেও তাঁদের কম তেল নিতে হচ্ছে। কয়েকজন ডিলার তাঁদের জানিয়েছেন, কোম্পানিগুলো সয়াবিন তেলের দাম আরেক দফা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। সে কারণেই সরবরাহ সীমিত করা হয়েছে বলে তাঁদের ধারণা।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারে কয়েকটি দোকান ঘুরে দেখা যায়, চাহিদার তুলনায় বোতলজাত সয়াবিন তেলের মজুত খুবই কম। অন্তত ছয়টি দোকানে মাত্র চার-পাঁচটি করে বোতল পাওয়া গেছে। কোনো দোকানে এক লিটারের বোতল নেই, আবার কোনো দোকানে পাওয়া যাচ্ছে না দুই লিটারের বোতল। পাঁচ লিটারের বোতলের সরবরাহও স্বাভাবিক নয়।

তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সমস্যা হচ্ছে, যে পরিমাণ তেল বাজারে আসছে, তা চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। সীমিত সরবরাহের কারণে কিছু দোকানি আবার তেলের বোতল প্রকাশ্যে না রেখে আলাদা করে রাখছেন।

মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের মুদি ব্যবসায়ী ইমান আলী বলেন, তাঁর দোকানে প্রতিদিন প্রায় ১০ কার্টন সয়াবিন তেলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ডিলারের কাছ থেকে তিনি পেয়েছেন মাত্র চার কার্টন।

তাঁর ভাষায়, নিয়মিত ক্রেতারা তেল চাইলে তাঁদের দিতে হয়। তাই সীমিত সরবরাহের মধ্যেও কিছু বোতল আলাদা করে রাখতে হচ্ছে।

খোলা তেলের দামও বাড়ছে

বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমে গেলে সাধারণত খোলা তেলের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়। বোতলজাত তেল না পেয়ে অনেক ক্রেতা তখন খোলা সয়াবিন তেল কিনতে শুরু করেন। চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর খুচরা দামও বেড়ে যায়।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রায় ১ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

একই সময়ে খোলা পাম তেলের দাম প্রায় শূন্য দশমিক ৮৮ শতাংশ বেড়ে লিটারপ্রতি ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকায় উঠেছে। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুই ধরনের খোলা তেলের দাম লিটারে প্রায় ২ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

ভোজ্যতেলের দাম বাড়ার বিষয়টি ভোক্তাদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রান্নার প্রায় সব ধরনের খাবার তৈরিতেই তেলের প্রয়োজন হওয়ায় এর দাম বাড়লে পরিবারের দৈনন্দিন খাদ্য ব্যয় সরাসরি বেড়ে যায়। সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এই বাড়তি খরচ সামাল দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

চলতি বছরে তৃতীয় দফা সরবরাহ সংকট

চলতি বছর এর আগেও কয়েক দফা বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে প্রথম দফায় সংকটের সূত্রপাত হয়। পরে এপ্রিলের শেষ দিকে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৪ টাকা বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা করা হয়।

জুলাই মাসের দিকে আবার সরবরাহে টান দেখা দেয়। এরপর ৩ সেপ্টেম্বর প্রতি লিটারে আরও ৫ টাকা বাড়িয়ে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ২০৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

এখন আবার বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় চলতি বছরে এটি তৃতীয় দফার সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রতিবার সরবরাহ সংকটের পর দাম বাড়ার ঘটনা ভোক্তাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

এর মধ্যেই দেশে ভোজ্যতেল পরিশোধন ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড ভেজিটেবল ফ্যাট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন সয়াবিন তেলের দাম আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। এ বিষয়ে গত ২০ সেপ্টেম্বর বাণিজ্যসচিবের কাছে চিঠি দিয়েছে সংগঠনটি।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো দাম বাড়ানোর অনুমোদন দেওয়া হয়নি। বুধবার সিলেটে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, ব্যবসায়ীরা ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর দাবি জানালেও সরকার বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেবে। যাচাই শেষ হওয়ার আগে দাম বাড়ানো হবে না বলেও তিনি জানান।

এক সপ্তাহে ডজনপ্রতি ডিম বেড়েছে ১০ টাকা

সয়াবিন তেলের বাজারে অস্থিরতার মধ্যেই গত এক সপ্তাহে ফার্মের মুরগির ডিমের দামও বেড়েছে। এক ডজন ডিমের দাম প্রায় ১০ টাকা বেড়ে এখন ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

পাড়া-মহল্লার মুদিদোকানে এক হালি ডিম কিনতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৫৫ টাকা। নিম্ন আয়ের অনেক পরিবার একসঙ্গে এক ডজন ডিম কেনার সামর্থ্য রাখে না। প্রয়োজন অনুযায়ী এক বা দুইটি করে ডিম কিনতে হয় তাদের। সে হিসাবে খুচরা বাজারে প্রতিটি ডিমের দাম প্রায় ১৫ টাকা পড়ছে।

ডিম সাধারণত তুলনামূলক কম খরচে প্রাণিজ আমিষ পাওয়ার একটি উৎস হিসেবে অনেক পরিবারের খাদ্যতালিকায় থাকে। ফলে ডিমের দাম বাড়লে সীমিত আয়ের পরিবারের খাবারের বাজেটেও তার প্রভাব পড়ে।

ব্রয়লার ও মাছেও স্বস্তি নেই

ডিমের পাশাপাশি ব্রয়লার মুরগির দামও বেশ কিছুদিন ধরে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বাজারে প্রায় দুই মাস ধরে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ২০০ টাকার আশপাশে বিক্রি হচ্ছে। এ সময়ে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি।

মাছের বাজারেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। দুই থেকে আড়াই কেজি ওজনের রুই মাছ প্রতি কেজি ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা, পাবদা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা এবং পাঙাশ ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

একসঙ্গে তেল, ডিম, মুরগি ও মাছের দাম তুলনামূলক বেশি থাকায় সীমিত আয়ের মানুষের খাদ্য ব্যয়ের ওপর চাপ বাড়ছে। অনেক পরিবারকে প্রয়োজনীয় পণ্যের পরিমাণ কমিয়ে দিতে হচ্ছে অথবা তুলনামূলক সস্তা বিকল্প বেছে নিতে হচ্ছে।

রাজধানীর শেখেরটেক এলাকার নিরাপত্তারক্ষী আনসার হোসেন বলেন, তাঁর আয় সীমিত। সেই আয়ে ব্রয়লার মুরগি ও ডিম কিনেই কোনোভাবে খাবারের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে মুরগির দাম না কমায় এবং ডিমের দাম ডজনপ্রতি ১৬০ টাকা হওয়ায় সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

বর্তমানে ভোজ্যতেলের বাজারে মূল নজর রয়েছে সরবরাহ স্বাভাবিক হয় কি না এবং কোম্পানিগুলোর দাম বাড়ানোর দাবি সরকার কীভাবে বিবেচনা করে তার ওপর। এর সঙ্গে ডিম, মুরগি ও মাছের বাড়তি দামও ভোক্তাদের দৈনন্দিন বাজার খরচে নতুন চাপ তৈরি করছে। ফলে বাজারে স্বস্তি ফিরতে হলে শুধু একটি পণ্যের নয়, একাধিক নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতির দিকে নজর দিতে হবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।