খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫
বাংলাদেশের মাটিতেই তাঁর জন্ম — ১৯২০ সালের ২০ অক্টোবর, মুন্সিগঞ্জের হাঁসাড়া গ্রামে। পরবর্তীকালে তিনি হয়ে ওঠেন ভারতীয় রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, পশ্চিমবঙ্গের প্রগতিশীল রাজনীতির প্রভাবশালী মুখ, বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। তাঁর সহধর্মিণী ছিলেন মায়া রায়।
১৯৫৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধান চন্দ্র রায়ের মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ার মাধ্যমে শুরু হয় সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের রাজনৈতিক জীবন। অশোক কুমার সেনের হাত ধরে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন তিনি, এবং মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ১৯৬০ সালে কেন্দ্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ভারতের শিক্ষা ও যুবকল্যাণমন্ত্রী। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ বিষয়ক অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্বজনমত গড়ে তুলতে তিনি তখন থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া সফর করেন — এক মহান মানবিক ও কূটনৈতিক দায়িত্ব নিয়ে।
১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গ পায় প্রশাসনিক দৃঢ়তা ও আইনের শাসনের নতুন দৃষ্টান্ত। পরবর্তী সময়ে তিনি পাঞ্জাবের রাজ্যপাল (১৯৮৬–১৯৮৯) ও যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রাষ্ট্রদূত (১৯৯২–১৯৯৬) হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতা ও মর্যাদার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনীতির বাইরে থেকেও তিনি ছিলেন বহু প্রজন্মের অভিভাবক। কংগ্রেস বা তৃণমূল — উভয় দলেরই শীর্ষ নেতারা নিয়মিত তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করতেন। শেষ জীবনে যদিও তিনি সক্রিয় রাজনীতির বাইরে ছিলেন, তবুও রাজ্য ও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর চিন্তা ছিল অনিঃশেষ। মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগেও রাজভবনে গিয়ে রাজ্যপাল এম. কে. নারায়ণনের সঙ্গে দেখা করে জঙ্গলমহল সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে মতামত দেন।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন এক বিরল ব্যক্তিত্ব — কখনো শাসক, কখনো বিরোধী, কখনো দলের অভ্যন্তরীন সমালোচক; কিন্তু সব ভূমিকাতেই নির্ভীক ও নীতিবান। মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন দুর্নীতির বিরুদ্ধে ওয়াংচু কমিশন গঠন করে তিনি দেখিয়েছিলেন রাজনৈতিক সততার এক দৃষ্টান্ত। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর ও পরস্পর শ্রদ্ধাপূর্ণ। এমনকি জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্তেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনীতির কঠিন প্রান্তরেও তাঁর ব্যক্তিজীবন ছিল অমায়িক ও সহজ। ‘মানুদা’ নামেই তিনি সবার প্রিয় ছিলেন। আইনের জগতে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র— তাঁর তীক্ষ্ণ যুক্তিবোধ ও প্রাঞ্জল বক্তৃতাশৈলী তাঁকে দিয়েছে অমর খ্যাতি।
সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় ছিলেন কেবল রাজনীতিক নন, তিনি ছিলেন একজন সংস্কৃতিমান, ক্রীড়াপ্রেমী, এবং সর্বোপরি মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর অবদান ও সহমর্মিতা আজও দুই বাংলার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে।
২০১০ সালের ৬ নভেম্বর, নব্বই বছর বয়সে তিনি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।
কিন্তু তাঁর কর্ম, তাঁর চিন্তা, এবং বাংলাদেশের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা আজও বেঁচে আছে দুই বাংলার হৃদয়ে।
খবরওয়ালা/এমএজেড