সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে শিশু চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু চোর সন্দেহে মো. আলম শেখ (৪১) নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। বুধবার (২১ অক্টোবর) দিবাগত রাতে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের সামনে এ ঘটনা ঘটে। শিশু চুরির সন্দেহে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুদের স্বজনেরা তাঁকে মারধর করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। একপর্যায়ে গুরুতর আহত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রিমন মিয়া এ তথ্য জানান। ঘটনার পর পুলিশ নিহত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করে তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, আলম শেখ মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন এবং মস্তিষ্কে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন।

পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত ১১টার দিকে আলম শেখ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের সামনে ঘোরাঘুরি করছিলেন। এ সময় সেখানে থাকা শিশুদের স্বজনদের সন্দেহ হয়, তিনি শিশু চুরির উদ্দেশ্যে হাসপাতালে এসেছেন। তাঁরা তাঁর পরিচয় ও হাসপাতালে আসার কারণ জানতে চান। কিন্তু তিনি সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

এরপর সন্দেহ ও ক্ষোভ থেকে কয়েকজন স্বজন তাঁকে টেনেহিঁচড়ে হাসপাতালের নিচে নিয়ে যান। সেখানে তাঁকে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে মারধরের কারণে তাঁর মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

তবে আলম শেখের বিরুদ্ধে শিশু চুরির কোনো অভিযোগের সত্যতা কিংবা এমন কোনো অপরাধে তাঁর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়ার কথা পুলিশ জানায়নি। ফলে কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে তাঁকে মারধর করা হয়েছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর, ঘটনাস্থলে পুলিশ

মারধরের ঘটনার পর জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আলম শেখের মরদেহ উদ্ধার করে।

এসআই রিমন মিয়া জানান, আঙুলের ছাপ পরীক্ষা করে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। আলম শেখ রাজধানীর রূপনগর এলাকার একটি টিনশেড বাসায় থাকতেন। তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পুলিশ জানতে পেরেছে, তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন এবং স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন।

পুলিশ মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠিয়েছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও শরীরে আঘাতের ধরন নির্ধারণে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

শেরেবাংলা নগর থানা-পুলিশ জানিয়েছে, আলম শেখের মরদেহ বুঝে নেওয়ার জন্য তাঁর পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়া হয়েছে। তবে এ ঘটনায় কতজন সরাসরি মারধরে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের পরিচয় কী এবং এ পর্যন্ত কাউকে আটক করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।

সন্দেহের ভিত্তিতে গণপিটুনি, উঠছে নিরাপত্তার প্রশ্ন

হাসপাতাল এমন একটি স্থান, যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী, স্বজন ও সেবাপ্রত্যাশী মানুষের যাতায়াত থাকে। বিশেষ করে শিশু ওয়ার্ডে সন্তানদের চিকিৎসা নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা স্বাভাবিকভাবেই সতর্ক থাকেন। কিন্তু কোনো ব্যক্তির আচরণ সন্দেহজনক মনে হলেও তাঁকে নিজেরা শাস্তি দেওয়া বা মারধর করার অধিকার কারও নেই।

শিশু চুরির মতো গুরুতর অপরাধের আশঙ্কা তৈরি হলে হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী, দায়িত্বরত কর্মকর্তা কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোই যথাযথ পদক্ষেপ। সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করা বা তাঁর পরিচয় যাচাই করার ক্ষেত্রেও আইনসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি।

এই ঘটনায় আলম শেখের মানসিক স্বাস্থ্য ও শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি পরিবারের বক্তব্যে উঠে এসেছে। তাঁর আচরণ বা কথাবার্তায় অসংগতি থাকলেও সেটিকে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। বিশেষ করে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভুগছেন এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বুঝে সহায়তা করা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসাকর্মী বা পুলিশের সাহায্য নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে হাসপাতালের মতো জনসমাগমপূর্ণ স্থানে এমন ঘটনা কীভাবে ঘটল, সেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থা কেমন ছিল এবং মারধরের সময় দায়িত্বরত ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল—এসব প্রশ্নও তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

আলম শেখের মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তির প্রাণহানির ঘটনা নয়; এটি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিপজ্জনক পরিণতির কথাও সামনে এনেছে। কোনো অভিযোগ সত্য কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার। সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে মারধর করে প্রাণ কেড়ে নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এখন ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং পুলিশের তদন্তের ভিত্তিতে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র সামনে আসার অপেক্ষা। একই সঙ্গে দায়ীদের শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সেদিকেও নজর রয়েছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।