খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 14শে মাঘ ১৪৩২ | ২৭ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
যশোর কারাগারে বন্দী ছাত্রলীগের বাগেরহাট সদর উপজেলা সভাপতি জুয়েল হাসান ওরফে সাদ্দামের জামিন মঞ্জুর করেছেন উচ্চ আদালত। তবে স্ত্রী ও নয় মাস বয়সী একমাত্র সন্তানের মৃত্যুর পর পাওয়া এই জামিনের খবরে আনন্দের বদলে সাদ্দামের পরিবারে বইছে শোকের মাতম। পরিবারের সদস্যদের মতে, যখন স্ত্রী-সন্তান বেঁচে ছিল, তখন বহু চেষ্টা করেও তাঁকে মুক্ত করা যায়নি। এখন ঘর শূন্য হওয়ার পর এই মুক্তি কেবল বেদনাই বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি, ২০২৬) সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ সাদ্দামকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন প্রদান করেন। এর আগে নিম্ন আদালতে কয়েক দফা জামিন আবেদন নাকচ হওয়ার পর গত সপ্তাহে হাইকোর্টে এই আবেদনটি করা হয়েছিল। সাদ্দামের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে আরও ছয়টি মামলা ছিল, যেগুলোতে তিনি আগেই জামিন পেয়েছিলেন। আজকের এই আদেশের ফলে তাঁর কারামুক্তিতে আর কোনো আইনি বাধা থাকছে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সাদ্দামের আইনি ও পারিবারিক ঘটনার সংক্ষিপ্ত সারণি:
| বিষয়ের বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| বন্দীর পরিচয় | জুয়েল হাসান ওরফে সাদ্দাম (সাবেক সভাপতি, বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগ)। |
| বর্তমান অবস্থান | যশোর জেলা কারাগার। |
| আদালতের আদেশ | সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় ৬ মাসের জামিন। |
| পারিবারিক ট্র্যাজেডি | ২৩ জানুয়ারি স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা ও ৯ মাসের পুত্র নাজিফের মৃত্যু। |
| গ্রেফতারের সময় | ৫ এপ্রিল, ২০২৫ (গোপালগঞ্জ থেকে)। |
| প্যারোলে মুক্তি | স্ত্রী-সন্তানের জানাজার জন্য আবেদন করলেও নামঞ্জুর করা হয়। |
| পারিবারিক প্রতিক্রিয়া | জামিনের খবরে সন্তোষের চেয়ে ক্ষোভ ও শোক বেশি। |
সাদ্দামের জামিনের খবরটি যখন বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়, তখন সেখানে চলছিল শোকের মাতম। সাদ্দামের মা দেলোয়ারা একরাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাংবাদিকদের বলেন, “আগেও কতবার জামিন চেয়েছি, কাজ হয়নি। এখন জামিন হয়ে কী হবে? আমার ছেলে বাড়ি ফিরে তো তার বউ আর কোলের শিশুর কবর দেখবে। এই শূন্য বাড়িতে সে কার মুখ দেখে থাকবে?”
সাদ্দামের শ্বশুর ও জাতীয় পার্টির নেতা রুহুল আমিন হাওলাদার এই জামিনে সন্তোষ প্রকাশ করলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রশাসনের ওপর। তিনি বলেন, “আমরা স্ত্রী-সন্তানের শেষ বিদায়ে অংশ নিতে সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তি চেয়েছিলাম। কিন্তু রাষ্ট্র সেই মানবিকতা দেখায়নি। কারাফটকে লাশবাহী গাড়িতে স্ত্রী-সন্তানকে দেখার সেই করুণ দৃশ্য দেশবাসী দেখেছে। এই অমানবিকতার বিচার আমরা আল্লাহর কাছে দিচ্ছি।”
গত শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সাদ্দামের বাড়ি থেকে তাঁর স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালী ও ৯ মাস বয়সী শিশু সন্তান সেজাদ হাসান নাজিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন বিকেলে লাশবাহী গাড়িতে করে মরদেহ দুটি যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে নেওয়া হয় যাতে বন্দী সাদ্দাম শেষবারের মতো তাঁদের দেখতে পারেন। কারাফটকের সেই হৃদয়বিদারক ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন প্রশ্ন তোলে, কেন এমন একটি স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে একজন বন্দীকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হলো না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাদ্দাম আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন। পরে ২০২৫ সালের ৫ এপ্রিল তাঁকে গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সেই থেকে তিনি বিভিন্ন মেয়াদে কারাবাস করছেন।
সাদ্দামের এই জামিন আইনি বিজয় হলেও পারিবারিক ও মানবিক দিক থেকে এটি এক চরম ট্র্যাজেডি। স্ত্রী-সন্তানের জানাজায় অংশ নিতে না পারা এবং প্রিয়জনদের কবরে রেখে ঘরে ফেরার এই যন্ত্রণা সাদ্দাম ও তাঁর পরিবারের জন্য দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত হয়ে থাকবে। এই ঘটনাটি বাংলাদেশের আইনি ব্যবস্থায় ‘মানবিক দিক’ বিবেচনায় প্যারোলে মুক্তির গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।