স্নাতক ডিগ্রি ছাড়াই গণিতের শিক্ষকতা করছেন ৮৭ ভাগ শিক্ষক

বাংলাদেশ শিক্ষা-তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ছাড়াই বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গণিতের শিক্ষকতা করছেন শতকরা ৮৭ ভাগ শিক্ষকসম্প্রতি প্রকাশিত এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে শিক্ষকের ঘাটতি, মানসম্মত পাঠদানের অভাব এবং শিক্ষার্থীদের সঠিক দিকনির্দেশনা না পাওয়ার বিষয়টি আরও একবার স্পষ্ট হয়েছে। এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ৬ লাখ ৬৬০ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে, যার এক-তৃতীয়াংশের ভরাডুবি হয়েছে গণিতে।

বিষয়ভিত্তিক ফলাফলে দেখা যায়, গণিতে ১১টি বোর্ডে গড় পাসের হার ৭৭.৪৬%, যেখানে অন্যান্য বিষয়ে পাসের হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি (যেমন— বাংলায় ৯৭.২৭%, পদার্থবিজ্ঞানে ৯৪.০২%, এবং রসায়নে ৯৪.৭৬%)। গণিতে গড়ে ২২.৫৪% শিক্ষার্থী ফেল করেছে। বরিশাল বোর্ডে গণিতে ফেলের হার সবচেয়ে বেশি: ৩৫.৩৮%।

শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা এই গণিতভীতির পেছনে দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতি এবং মুখস্থনির্ভর শিক্ষাপদ্ধতিকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

গণিতভীতির মূল কারণ: দক্ষ শিক্ষকের অভাব
বাংলাদেশ শিক্ষা-তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে ৬৪ হাজার ১৪৭ জন গণিত শিক্ষক থাকলেও, ৮৬.৭৮% শিক্ষকের গণিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেই। অর্থাৎ, মাত্র ১৩.২২% গণিত শিক্ষকের গণিত বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি রয়েছে। মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে ৫.৯৮% স্নাতক (অনার্স) এবং ৭.২৪% স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী।

এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে, মাধ্যমিক স্তরের অধিকাংশ শিক্ষকই গণিতের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন নন। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এর ফলে গণিত বিষয়টিকে তারা শিক্ষার্থীদের কাছে দুর্বোধ্য করে তোলেন এবং গণিত শেখানোর পদ্ধতি মুখস্থনির্ভর হয়ে পড়ে।

মুখস্থনির্ভরতা এবং মৌলিক ধারণার অভাব
শিক্ষাবিদ এবং ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সাবেক কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক শিক্ষার্থীদের গণিত মুখস্থ করান। তারা সাজেশন দিয়ে দেন, যা মুখস্থ করে শিক্ষার্থীরা হয়তো পাশ করে যেতে পারে, কিন্তু গণিতের মূল ধারণা এবং ব্যবহারিক প্রয়োগ তারা বুঝতে পারে না।

শিক্ষার্থীরা মুখস্থ করা গাণিতিক সমস্যা থেকে সামান্য ভিন্ন কোনো সমস্যায় পড়লেই ভুল করে। এটি গণিতভীতির অন্যতম প্রধান কারণ।

প্রাথমিক স্তর থেকেই গণিতভীতির সূত্রপাত
শিক্ষাবিদরা মনে করেন, এই গণিতভীতির সৃষ্টি হচ্ছে প্রাথমিক স্তর থেকেই। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির (নেপ) একটি গবেষণা অনুযায়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করেও প্রায় ৯০% শিশু গণিতের ন্যূনতম জ্ঞান অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে।

নেপের গবেষণায় উঠে এসেছে যে, প্রাথমিক শিক্ষকদের কাছেও গণিত একটি কঠিন বিষয়। জরিপে অংশ নেওয়া শতভাগ সহকারী শিক্ষকই গণিত পাঠদানকে কঠিন মনে করেন। এছাড়া, ৭৫% প্রধান শিক্ষক এবং শতভাগ সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও ইউআরসি ইনস্ট্রাক্টর জানিয়েছেন, শিক্ষকরা গণিত পাঠদানে ‘ডিফিকাল্টি’ অনুভব করেন। শিক্ষকদের এই দুর্বলতা শিক্ষার্থীদের গণিতভীতিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

গণিতভীতি দূর করতে শিক্ষাপদ্ধতি পরিবর্তনের তাগিদ
শিক্ষাবিদরা গণিতভীতি দূর করতে শিক্ষাপদ্ধতি পরিবর্তনের উপর জোর দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক কিছু মডেল এক্ষেত্রে অনুসরণযোগ্য:

ফিনল্যান্ড: ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থায় কোনো আলাদা পরীক্ষা বা গ্রেডিং পদ্ধতি নেই। শিক্ষার্থীরা প্রকৃতির সাথে মিশে শেখে, যা গণিতকে তাদের কাছে আনন্দের বিষয় করে তোলে।

যুক্তরাজ্য: যুক্তরাজ্যে গণিত শেখানোর জন্য গেম-ভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, যেখানে শিক্ষার্থীরা খেলার ছলে যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ শেখে।

যুক্তরাষ্ট্র: কিছু স্কুল মন্টেসরি পদ্ধতি অনুসরণ করে, যেখানে বাস্তব উপকরণ ব্যবহার করে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে সংখ্যা গণনা করে শেখে।

খবরওয়ালা/টিএস

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।