খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৩ মে ২০২৬
“লিচু বাগান থেকে নিসবেতগঞ্জ যাওয়ার পথে জিপের পিছনে বাঁধা শৈলেন দত্ত ছিন্নভিন্ন হয়ে মিশে গিয়েছিলেন পথের ধুলায়…”
১৯৭১ সালের ২৩ মে। রোববারের সেই রাত আজও রংপুরের ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় স্মৃতি হয়ে আছে। ধর্মের রক্ষক দাবিদার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সেদিন মানবতার মুখোশ ছিঁড়ে প্রকাশ করেছিল তাদের প্রকৃত বর্বরতা। রংপুর শহরের প্রাণকেন্দ্র লিচু বাগান, গোমস্তাপাড়া, দেওয়ানবাড়ি রোড ও নিসবেতগঞ্জ এলাকায় সংঘটিত হয়েছিল এক নির্মম হত্যাযজ্ঞ—যার প্রতিটি স্মৃতি আজও শিউরে ওঠার মতো।
রাতের খাবার খেতে বসেছিলেন ইলেকট্রিক মিস্ত্রি শৈলেন দত্ত। হঠাৎ দরজার বাইরে ভেসে আসে গালিগালাজ—
“শালা মালাউনের বাচ্চা, দরজা খোল!”
দরজা খুলতেই পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে ঢুকে পড়ে স্থানীয় কিছু রাজাকার। তারা ধরে নিয়ে যায় শৈলেন দত্ত, প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট পূর্ণচন্দ্র সরকার এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শংকর বনিককে।
পূর্ণচন্দ্র সরকার ও শংকর বনিককে তোলা হয় আর্মির জিপে। কিন্তু শৈলেন দত্তের জন্য নির্ধারিত ছিল আরও ভয়ংকর মৃত্যু। তার দুই পা শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হয় জিপের পেছনে। তারপর ছুটে চলে সামরিক জিপ—আর জিপের পেছনে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় এক জীবন্ত মানুষকে। তার আর্তচিৎকারে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল পুরো মহল্লা। একসময় সেই আর্তনাদও থেমে যায়। পরদিন পাওয়া যায় শুধু তার রক্তমাখা লুঙ্গি।
সেদিন নিসবেতগঞ্জ বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয়েছিল অর্ধশতাধিক নিরীহ বাঙালিকে। শহীদদের মধ্যে ছিলেন রংপুরের শ্রদ্ধেয় বুদ্ধিজীবী অ্যাডভোকেট বিজয় চন্দ্র মৈত্র (সবার প্রিয় পাখিদা), অ্যাডভোকেট পূর্ণচন্দ্র সরকার, শংকর বনিকসহ অসংখ্য নাম না জানা মানুষ।
পাখিদা ছিলেন রংপুরের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনের প্রাণপুরুষ। শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাকে দেশ ছাড়ার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তিনি বলেছিলেন—
“জন্মভূমির দুর্দিনে দেশ ত্যাগ করা মহাপাপ এবং অন্যায়।”
মাতৃভূমির প্রতি সেই অগাধ ভালোবাসার মূল্য তিনি দিয়েছিলেন নিজের জীবন দিয়ে। ২৫ মে মধ্যরাতে তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয় নিসবেতগঞ্জে।
আজ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি নিসবেতগঞ্জ বধ্যভূমিসহ মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদকে, যারা নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে আমাদের জন্য রেখে গেছেন একটি স্বাধীন পতাকা, একটি স্বাধীন মানচিত্র।
তাদের রক্তের ঋণ কোনোদিন শোধ হওয়ার নয়।
তাদের আত্মত্যাগ বাঙালির ইতিহাসে চির অম্লান হয়ে থাকবে।
বিনম্র শ্রদ্ধা সকল বীর শহীদের প্রতি।
২৩ মে’র এই বেদনাবিধুর দিনে রইলো গভীর ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞ স্মরণ।