স্বাধীনতা ও বাজেটের ঘাটতি: সংকটে সরকারি কর্ম কমিশন

বাংলাদেশের আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু এবং সিভিল সার্ভিসে মেধা যাচাইয়ের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) বর্তমানে বহুমুখী সংকটের আবর্তে নিমজ্জিত। ৪৬তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে ‘সার্কুলার ইভ্যালুয়েশন সিস্টেম’ চালু করে রেকর্ড সময়ে কাজ শেষ করলেও, বাজেট স্বল্পতা ও প্রশাসনিক পরাধীনতার কারণে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। খাতা মূল্যায়নের দীর্ঘ সময় পার হলেও সম্মানী পাননি পরীক্ষকেরা, যা কমিশনের পেশাদারিত্বের ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।

আর্থিক পরাধীনতা ও বাজেট সংকট

পিএসসি বর্তমানে এক অভূতপূর্ব চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাধারণত একটি বিসিএস পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ থাকলেও, বর্তমান কমিশনকে ৪৪তম থেকে শুরু করে ৫০তম বিসিএস পর্যন্ত মোট সাতটি বিসিএসের বিশাল কর্মযজ্ঞ একযোগে সামলাতে হচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ কাজের বিপরীতে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান কমিশনের হাতে নেই। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে বাজেটের চাহিদাপত্র পাঠানো হলেও দীর্ঘসূত্রতার কারণে তা ছাড় পেতে বিলম্ব হচ্ছে। ফলে আধুনিক পদ্ধতিতে খাতা দেখা শেষ হলেও শিক্ষকদের সম্মানী পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

কমিশনের বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও কার্যক্রমের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:

বিষয় বিবরণ ও বর্তমান অবস্থা
চলমান বিসিএস ৪৪তম থেকে ৫০তম (মোট ৭টি বিসিএস)
নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি সার্কুলার ইভ্যালুয়েশন সিস্টেম (দ্রুততম ফলাফল নিশ্চিতে)
আর্থিক সংকট পরীক্ষকদের সম্মানী বকেয়া ও বাজেট পাসের দীর্ঘসূত্রতা
প্রশাসনিক বাধা ক্ষুদ্র বিধি সংশোধনেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন
সাফল্য ৪৭তম প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফলাফল রেকর্ড ৯ দিনে প্রকাশ
লক্ষ্যমাত্রা ‘ওয়ান বিসিএস ওয়ান ইয়ার’ (এক বছরে একটি বিসিএস শেষ করা)

প্রশাসনিক স্বাধীনতার অভাব ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা

সংবিধান অনুযায়ী পিএসসি একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে এর চিত্র ভিন্ন। পিএসসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমের মতে, ২০১১ সালের পর থেকে রাজনৈতিক প্রভাবে কমিশন কার্যত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি অধীনস্থ দপ্তরের মতো কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। ছোটখাটো বিধি সংশোধন কিংবা নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারির ক্ষেত্রেও মাসের পর মাস মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, ৪৮তম ও ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের বিধি প্রণয়ন করতেই সময় লেগেছে প্রায় সাড়ে তিন মাস। এই প্রশাসনিক পরাধীনতা কমিশনের স্বকীয়তা ও কার্যকারিতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

চাকরিপ্রার্থীদের অসন্তোষ ও আস্থাহীনতা

পিএসসির এই সীমাবদ্ধতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের ওপর। ৪৪তম বিসিএসের ‘রিপিট ক্যাডার’ জটিলতা নিরসনে দীর্ঘ সময় ক্ষেপণ এবং ৪৫তম বিসিএসের নন-ক্যাডার পদ সংখ্যা নিয়ে চলমান আন্দোলন চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি করেছে। একদিকে সরকারি দপ্তরে চার লক্ষাধিক পদ শূন্য পড়ে আছে, অন্যদিকে আইনি ও আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচে পিএসসি পর্যাপ্ত প্রার্থী সুপারিশ করতে পারছে না। সম্প্রতি ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের প্রশ্নপত্রে অসংখ্য বানান ও তথ্যগত ভুল কমিশনের পেশাদারিত্বকে আরও প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

উত্তরণের পথ ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য

বর্তমান কমিশন মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ১০০-তে নামিয়ে আনা এবং বিসিএস আবেদন ফি কমানোর মতো কিছু জনবান্ধব পদক্ষেপ নিয়েছে। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন সুপারিশ করেছে বিসিএস প্রক্রিয়া এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে শেষ করার জন্য একটি বার্ষিক ক্যালেন্ডার অনুসরণের। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল ক্যালেন্ডার বা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই হবে না; পিএসসির পূর্ণ প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিদওয়ানুল হকের মতে, পিএসসিকে কেবল নামমাত্র স্বাধীন থাকলে চলবে না, বরং নিরপেক্ষভাবে কাজ করার জন্য এর পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে হবে। স্বচ্ছতা, নির্ভুল প্রশ্নপত্র প্রণয়ন এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে উঠতে পারলেই কেবল পিএসসি তার হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।