স্মরণে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ

বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য ছাত্রনেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও বাংলাদেশের রাজনীতির এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের জীবনকাহিনি একটি সময়ের আন্দোলন-সংগ্রাম, স্বপ্ন, সাহস ও আত্মত্যাগের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে থাকে। তোফায়েল আহমেদ তেমনই একজন রাজনীতিবিদ। ষাটের দশকের উত্তাল ছাত্ররাজনীতি, ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতির নানা বাঁকবদলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্নেহধন্য এই ছাত্রনেতা ‘উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক’ হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেন। তাঁর জীবন কেবল একজন রাজনীতিবিদের উত্থান-পতনের গল্প নয়; এটি একটি জাতির অধিকার আদায়ের সংগ্রামেরও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

জন্ম ও শৈশব

তোফায়েল আহমেদ ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর দ্বীপজেলা ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মৌলভী আজহার আলী এবং মাতা ফাতেমা খানম। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, সাহসী ও নেতৃত্বের গুণাবলিসম্পন্ন।

ভোলা সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি বরিশালের ব্রজমোহন কলেজে পড়াশোনা করেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ছাত্রজীবনেই রাজনীতি, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা গড়ে ওঠে।

ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় নেতৃত্ব

ষাটের দশকে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক আকাশ ছিল আন্দোলন-সংগ্রামে উত্তাল। বাঙালির স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গড়ে উঠছিল গণআন্দোলন। সেই ঐতিহাসিক সময়ে ছাত্রসমাজের অগ্রভাগে উঠে আসেন তোফায়েল আহমেদ।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৮-৬৯ সালে ছাত্রসমাজের আন্দোলন সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্ব বিশেষ গুরুত্ব অর্জন করে।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তিনি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বন্দি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্য অভিযুক্তের মুক্তির দাবিতে দেশজুড়ে যে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে, তা ক্রমে গণমানুষের বিস্ফোরিত ক্ষোভ ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামে রূপ নেয়।

ছাত্র-জনতার সেই ঐতিহাসিক আন্দোলন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে নতিস্বীকারে বাধ্য করে। মুক্তি পান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন নতুন গতি লাভ করে।

১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে—বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে—বঙ্গবন্ধুকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ঐতিহাসিক জনসভায় তোফায়েল আহমেদ এই উপাধি ঘোষণা করেন। ঘটনাটি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় এবং বাংলাদেশের ইতিহাসেরও এক তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক

১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তোফায়েল আহমেদ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। বাঙালির গণরায়, স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তখন একসূত্রে গাঁথা হয়ে উঠছিল।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি মুক্তিসংগ্রামের সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে মুজিব বাহিনীর অন্যতম আঞ্চলিক প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। স্বাধীনতার সংগ্রামে তাঁর এই ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তোফায়েল আহমেদ। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহকর্মী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা ও স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের সময়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যুক্ত ছিলেন।

কারাবরণ, প্রতিকূলতা ও রাজনৈতিক সংগ্রাম

রাজনৈতিক জীবনে তোফায়েল আহমেদকে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকতে হয় তাঁকে।

পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম এবং আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। কারাবাস ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতা অতিক্রম করে তিনি দলটির গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হন। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর জীবনের শেষ পর্যায়ে দলটির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন।

তাঁর রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের ইতিহাসের উত্থান-পতন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং ক্ষমতার পরিবর্তনের নানা অধ্যায়ের সাক্ষী।

সংসদ ও মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তোফায়েল আহমেদ নয়বার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংসদীয় রাজনীতিতে তাঁর অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘ পথচলা তাঁকে দেশের প্রবীণ রাজনীতিবিদদের অন্যতম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। পরবর্তী সময়ে শিল্প মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ২০১৩-১৪ সালে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও ছিলেন। ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

শিল্পায়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, দেশীয় উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান জোরদারের মতো বিষয় তাঁর মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। দীর্ঘ সংসদীয় ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার কারণে জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর আলাদা পরিচিতি গড়ে ওঠে।

ব্যক্তিজীবন ও জনকল্যাণের ভাবনা

ব্যক্তিজীবনে তোফায়েল আহমেদের সহধর্মিণী ছিলেন আনোয়ারা বেগম। তাঁদের একমাত্র কন্যা চিকিৎসক তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী।

২০২১ সালে নিজের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি তোফায়েল আহমেদ ফাউন্ডেশনে দান করার ঘোষণা দেন তিনি। ফাউন্ডেশনটির লক্ষ্য ছিল স্বাস্থ্যসেবা, বয়স্কদের সহায়তা এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কল্যাণে কাজ করা। জনকল্যাণমূলক এই উদ্যোগ তাঁর জীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে আলোচিত হয়েছে।

১ জুন ২০২৬—এক রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান

দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভোগার পর ২০২৬ সালের ১ জুন রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮২ বছর বয়সে তোফায়েল আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

একসময় রাজপথের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো প্রত্যক্ষ করেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশে সংসদ ও মন্ত্রিসভায় ভূমিকা রেখেছেন—এমন একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদের বিদায় স্বাভাবিকভাবেই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

তাঁর জীবন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ইতিহাসের সাফল্য, সীমাবদ্ধতা, বিতর্ক ও পরিবর্তন—সবকিছুকেই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তবে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে তাঁর ভূমিকা বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে।

ইতিহাসের পাতায় তোফায়েল আহমেদ

রাজনীতির পথ কখনো মসৃণ নয়। সেখানে থাকে আদর্শের দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার টানাপোড়েন, অর্জন, ব্যর্থতা এবং সময়ের কঠিন পরীক্ষা। তোফায়েল আহমেদের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনও এসবের বাইরে নয়। তবু বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর নাম উচ্চারিত হবে বিশেষভাবে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের একজন প্রধান ছাত্রনেতা, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে।

একটি প্রজন্মের কাছে তিনি ছিলেন আন্দোলনের মঞ্চের পরিচিত কণ্ঠ; আরেক প্রজন্মের কাছে তিনি ছিলেন সংসদ ও মন্ত্রিসভার অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। সময়ের ব্যবধানে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নানা দিক নতুন করে মূল্যায়িত হবে, কিন্তু ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা অস্বীকার করার উপায় নেই।

মানুষ চলে যান, কিন্তু ইতিহাসে রেখে যান তাঁর সময়ের স্বাক্ষর। তোফায়েল আহমেদও রেখে গেছেন তেমনই এক দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তরাধিকার—যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতির বহু স্মৃতি।

আজ তাঁর প্রয়াণে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি এই প্রবীণ রাজনীতিবিদকে।

শ্রদ্ধাঞ্জলি—উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ।

তাঁর জীবন ও কর্ম বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আলোচিত ও মূল্যায়িত হোক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।