খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
বাংলার লোকসংগীতের ইতিহাসে কিছু নাম চিরকাল দীপশিখার মতো জ্বলজ্বল করবে। সেই উজ্জ্বল নক্ষত্রদের অন্যতম কানাইলাল শীল—যিনি তাঁর অসাধারণ দোতারাবাদনের জন্য “দোতারার যাদুকর” নামে সমধিক পরিচিত। তিনি ছিলেন একাধারে দোতারা বাদক, সুরকার, লোকসংগীত রচয়িতা, সংগ্রাহক এবং বাংলা লোকসংগীতকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করে তোলার অন্যতম পথিকৃৎ।
১৮৯৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ফরিদপুর জেলার (বর্তমান ফরিদপুর) নগরকান্দা উপজেলার কইরাল গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা আনন্দচন্দ্র শীল এবং মাতা সৌদামিনী শীল। মাত্র আড়াই বছর বয়সেই তিনি পিতৃহারা হন। শৈশবের দুঃখ-কষ্ট তাঁর শিল্পীসত্তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি; বরং সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তিনি নিজেকে গড়ে তোলেন।
মাত্র আট বছর বয়সে ওস্তাদ বসন্ত কুমার শীলের কাছে বেহালার হাতেখড়ি হয় তাঁর। এগারো বছর বয়সে ওস্তাদ মতিলালের কাছে বেহালা শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ তালিম সম্পন্ন করেন। কিন্তু তাঁর প্রকৃত পরিচয় গড়ে ওঠে দোতারাকে সঙ্গী করে। তাঁর আঙুলের স্পর্শে দোতারার তারে যে সুর ঝংকার তুলত, তা গ্রামবাংলার মাটি, নদী, মানুষের সুখ-দুঃখ আর লোকজ জীবনের কথা যেন অনায়াসে বলে উঠত।
ফরিদপুরের অম্বিকাপুরে এক যাত্রাপালার আসরে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় পল্লীকবি জসীমউদ্দীন-এর। এই পরিচয়ই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। জসীমউদ্দীন তাঁকে কলকাতায় নিয়ে যান, যেখানে তাঁর পরিচয় ঘটে কিংবদন্তি লোকসংগীতশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ-এর সঙ্গে। আব্বাসউদ্দীনের উৎসাহ ও সহযোগিতায় তিনি লোকগান রচনা ও সুরারোপে আত্মনিয়োগ করেন এবং তৎকালীন গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হন।
কলকাতার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তিনি কাজী নজরুল ইসলাম-এর সান্নিধ্য লাভ করেন। নজরুলের অসংখ্য গানে দোতারা বাজিয়ে তিনি নতুন মাত্রা যোগ করেন। পরবর্তীকালে তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিও, কলকাতা কেন্দ্র-এর নিয়মিত দোতারাবাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর পরিবেশনা লোকসংগীতকে শহুরে শ্রোতার কাছেও সমান জনপ্রিয় করে তোলে।
কানাইলাল শীল শুধু একজন দক্ষ বাদ্যশিল্পী ছিলেন না; তিনি বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে লোকগান সংগ্রহ করেছেন, হারিয়ে যেতে বসা অসংখ্য সুর সংরক্ষণ করেছেন এবং নতুন প্রজন্মের কাছে লোকসংগীতের ঐশ্বর্য পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। তাঁর শিল্পসাধনা বাংলা লোকঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ।
বাংলাদেশ সরকার তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৭ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করে। এটি ছিল তাঁর শিল্পজীবনের প্রতি জাতির গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ।
১৯৭৪ সালের ২০ জুলাই ঢাকায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু শিল্পীর মৃত্যু হলেও তাঁর সুরের মৃত্যু হয় না। দোতারার প্রতিটি তারে আজও যেন অনুরণিত হয় কানাইলাল শীলের স্পর্শ, তাঁর সাধনা এবং বাংলার লোকজ সংস্কৃতির অমলিন সৌন্দর্য।
আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি এই মহান লোকসংগীত সাধককে। তাঁর সুর, তাঁর সংগ্রহ এবং তাঁর শিল্পসাধনা বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে। নতুন প্রজন্ম তাঁর জীবন ও কর্ম থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করুক—এই প্রত্যাশাই রইল।
বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।