খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জুলাই ২০২৬, ২:৫৪ পিএম
বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামের কথা উঠলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ ১৯৫২ সালের ভাষা শহীদদের অমর আত্মত্যাগ। তাঁদের রক্তে রচিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গৌরবময় ইতিহাস।
কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন, বাংলাদেশের সীমানার ওপারেও বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বহুবার রক্ত ঝরেছে। ভারতের আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রামে একাধিকবার প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন ভাষাপ্রেমী বাঙালিরা। সেই ইতিহাস আজও সমান গৌরবের, সমান বেদনার; অথচ এপার বাংলায় তা প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়।
আজ ২১ জুলাই। ১৯৮৬ সালের এই দিনে আসামের করিমগঞ্জে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন জগন্ময় দেব ও দিব্যেন্দু দাশ। তাঁদের আত্মাহুতির মধ্য দিয়ে বরাক উপত্যকার ভাষা শহীদের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩-এ।
ভাষা আন্দোলনের পটভূমি
১৯৬০ সালের এপ্রিলে আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি অসমীয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অথচ বরাক উপত্যকার অধিকাংশ মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। এই বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রবল গণআন্দোলন গড়ে ওঠে কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি জুড়ে।
এরই মধ্যে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বাঙালিদের ওপর নেমে আসে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত হামলা। হাজার হাজার বাঙালি পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। সরকারি তদন্ত কমিশনের তথ্যমতে, কামরূপ জেলার ২৫টি গ্রামে ৪,০১৯টি কুঁড়েঘর ও ৫৮টি পাকা বাড়ি ধ্বংস করা হয়; বহু মানুষ আহত হন এবং অন্তত নয়জন বাঙালি নিহত হন।
এই দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্যেই বাংলা ভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
১৯ মে ১৯৬১ : বরাক উপত্যকার একুশে
১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচর রেলস্টেশনে বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে শান্তিপূর্ণ সত্যাগ্রহ চলাকালে আসাম পুলিশ নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে।
সেদিন শহীদ হন বাংলা ভাষার ১১ জন সাহসী সন্তান—
– কানাইলাল নিয়োগী
– চণ্ডীচরণ সূত্রধর
– হিতেশ বিশ্বাস
– সত্যেন্দ্র দেব
– কুমুদরঞ্জন দাস
– সুনীল সরকার
– তরণী দেবনাথ
– শচীন্দ্র চন্দ্র পাল
– বীরেন্দ্র সূত্রধর
– সুকমল পুরকায়স্থ
– কমলা ভট্টাচার্য
তাঁদের আত্মদানের পর আসাম সরকার বরাক উপত্যকায় বাংলাকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। ১৯ মে তাই বরাক উপত্যকার মানুষের কাছে ভাষা শহীদ দিবস—তাদের নিজস্ব একুশে।
আবারও রক্তাক্ত ২১ জুলাই
কিন্তু সংগ্রাম থেমে থাকেনি।
১৯৮৬ সালে আসাম সরকার বরাক উপত্যকার বিদ্যালয়গুলোতে অসমীয়া ভাষা বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নিলে আবারও প্রতিবাদের আগুন জ্বলে ওঠে।
২১ জুলাই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর করিমগঞ্জ সফরের দিন এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই শহীদ হন জগন্ময় দেব ও দিব্যেন্দু দাশ।
তাঁদের আত্মত্যাগ প্রমাণ করে, ভাষার অধিকার কখনো দান নয়; তা সংগ্রাম ও আত্মবলিদানের মাধ্যমে অর্জিত হয়।
ভাষার জন্য আরেকটি আত্মত্যাগ
বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এখানেই শেষ নয়। বাংলা ভাষার পাশাপাশি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও প্রাণ দিতে হয়েছে মণিপুরি কন্যা সুদেষ্ণা সিংহকে। ভাষাগত বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক অধিকারের সংগ্রামে তাঁর আত্মদানও সমানভাবে স্মরণীয়।
শ্রদ্ধাঞ্জলি
বাংলা ভাষা কেবল একটি যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয় ও অস্তিত্বের প্রতীক। বরাক উপত্যকার ভাষা শহীদরা আমাদের মনে করিয়ে দেন—মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম কোনো এক দেশের নয়, সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী মানুষের অভিন্ন ইতিহাস।
আজ গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি শিলচরের অমর ১১ ভাষা শহীদ, করিমগঞ্জের ভাষা শহীদ জগন্ময় দেব ও দিব্যেন্দু দাশ, এবং ভাষার অধিকার রক্ষায় আত্মোৎসর্গকারী সকল শহীদকে।
তাঁদের রক্তঋণে বাংলা ভাষা আরও গৌরবান্বিত, আরও মর্যাদাময়। তাঁদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র প্রণাম।
মন্তব্য