এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: 14শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ২৭ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আবদুস সামাদ আজাদ এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি ছিলেন একাধারে প্রজ্ঞাবান রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি ও সাবেক মন্ত্রী—যাঁর দীর্ঘ সংগ্রামী জীবন দেশ ও জাতির জন্য উৎসর্গিত।
১৯২২ সালের ১৫ জানুয়ারি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার ভুরাখালি গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা মোহাম্মদ শরিয়তুল্লাহ। ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি প্রকাশ পায়। ১৯৪৩ সালে সুনামগঞ্জ সরকারি হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৪৮ সালে সিলেটের মুরারী চাঁদ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
রাজনীতিতে তাঁর পদার্পণ ঘটে ১৯৪০ সালে সুনামগঞ্জ মহকুমা মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে। ১৯৪৪ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত সিলেট জেলা ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি হিসেবে তিনি বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন এবং একাধিকবার গ্রেফতার হন।
পঞ্চাশের দশকের শুরুতে কিছুদিন শিক্ষকতা ও বীমা পেশায় যুক্ত থাকলেও তাঁর মূল পথ ছিল রাজনীতি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য তিনি কারাবরণ করেন—যা তাঁর দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
১৯৫৩ সালে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে সুনামগঞ্জ থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি গণমানুষের আস্থা অর্জন করেন। ১৯৫৫ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে কেন্দ্রীয় শ্রমবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে আদর্শগত কারণে দল বিভক্ত হলে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে কৃষক শ্রমিক পার্টিতে যোগ দেন।
১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারির পর তাঁকে আটক করা হয় এবং চার বছর কারাভোগের পর মুক্তি পান। ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধেও তাঁর সাহসী ভূমিকা ছিল, যার জন্য আবারও তাঁকে গ্রেফতার হতে হয়।
১৯৬৯ সালে তিনি পুনরায় আওয়ামী লীগে ফিরে এসে সিলেট জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন মুজিবনগর সরকারের অন্যতম সংগঠক। শুরুতে রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও ভ্রাম্যমাণ রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে স্বাধীনতার প্রাক্কালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারে কৃষিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৩ সালের নির্বাচনে তিনি দুটি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনেও সুনামগঞ্জ-৩ আসন থেকে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে তাঁর জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ দেন।
১৯৭৫ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর তাঁকে আবারও গ্রেফতার করা হয় এবং ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত কারাবন্দি থাকেন।
দীর্ঘ সংগ্রামমুখর জীবন শেষে ২০০৫ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকায় তিনি পরলোকগমন করেন।
দেশপ্রেম, আদর্শ ও ত্যাগের প্রতীক এই মহান নেতার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।