খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
স্মরণ
কথাসাহিত্যিক
হাসান আজিজুল হক
বাংলা কথাসাহিত্যে যাঁরা নিভৃত অথচ গভীর আলো জ্বেলে গেছেন, হাসান আজিজুল হক তাঁদের অন্যতম। তিনি ছিলেন মানুষের জীবনসংগ্রামের নির্ভীক কথক, সমাজের প্রান্তিক মানুষের নীরব আর্তির ভাষ্যকার। ষাটের দশকে আবির্ভূত এই প্রখ্যাত ছোটগল্পকার ও কথাসাহিত্যিক তাঁর সংহত গদ্য, নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি ও মর্মস্পর্শী বর্ণনাভঙ্গির মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে এক স্বতন্ত্র উচ্চতা অর্জন করেন।
জীবনসংগ্রামে লিপ্ত মানুষের দুঃখ, ক্ষুধা, প্রেম, ক্ষোভ ও অস্তিত্ব সংকট তাঁর গল্প–উপন্যাসের প্রধানতম অনুষঙ্গ। রাঢ়বঙ্গের শুষ্ক প্রকৃতি, খরখরে মাটি, অভাবী মানুষের নিরেট জীবনচিত্র তাঁর অনেক গল্পের পটভূমিতে গভীর ছাপ রেখে গেছে। তাঁর সাহিত্য কোনো অলংকারপ্রবণ সৌন্দর্যচর্চা নয়—এটি জীবনের রুক্ষ বাস্তবতার নিরাভরণ দলিল।
হাসান আজিজুল হক ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ১৯৯৯ সালে একুশে পদকে ভূষিত করে। এ ছাড়া ২০১২ সালে ভারতের অসম বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট ডিগ্রি প্রদান করে।
তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার যবগ্রামে, এক সম্ভ্রান্ত ও একান্নবর্তী পরিবারে। পিতা মোহাম্মদ দোয়া বখশ এবং মাতা জোহরা খাতুন। তাঁর সহধর্মিণী ছিলেন শামসুন নাহার বেগম। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি রাজশাহীতে কাটিয়েছেন—যে শহরটি তাঁর মনন, শিক্ষকতা ও সাহিত্যসৃষ্টির প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন কৃতী ছাত্র। ১৯৫৮ সালে রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে দর্শনশাস্ত্রে সম্মানসহ স্নাতক এবং ১৯৬০ সালে একই প্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। দর্শনের যুক্তিবোধ ও মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর সাহিত্যচিন্তায় সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক এন সাথে অন্তরঙ্গ মুহূর্তে খবরওয়ালা সম্পাদক
১৯৬০ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত তিনি রাজশাহী সিটি কলেজ, সিরাজগঞ্জ কলেজ, খুলনা গার্লস কলেজ ও দৌলতপুর ব্রজলাল কলেজে অধ্যাপনা করেন। ১৯৭৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়ে টানা ৩১ বছর—২০০৪ সাল পর্যন্ত—শিক্ষাদানে নিয়োজিত ছিলেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন প্রজ্ঞাবান, সংবেদনশীল ও ছাত্রবান্ধব।
রাজশাহী কলেজে অধ্যয়নকালে তরুণ মিসবাহুল আজিমের সম্পাদনায় প্রকাশিত ভাঁজপত্র ‘চারপাতা’-য় তাঁর প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়। বিষয় ছিল—রাজশাহীর আমের মাহাত্ম্য। যদিও বিষয়টি ছিল সরল, তবু সেখানেই ভবিষ্যৎ কথাসাহিত্যিকের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রথম ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
খুলনায় অবস্থানকালে তাঁর সাহিত্যসৃষ্টির প্রকৃত উৎসমুখ উন্মোচিত হয় প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সন্দীপন’-কে কেন্দ্র করে। ষাটের দশকের শুরুতে নাজিম মাহমুদ, মুস্তাফিজুর রহমান, জহরলাল রায়, সাধন সরকার, খালেদ রশিদ প্রমুখ সংগ্রামী তরুণদের উদ্যোগে গড়ে ওঠে সন্দীপন গোষ্ঠী। ততদিনে হাসান আজিজুল হক ইতোমধ্যেই সাহিত্যাঙ্গনে সুপরিচিত নাম।
তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য’-এর প্রথম গল্প ‘শকুন’-এ তিনি সুদখোর মহাজন ও গ্রামীণ সমাজের তলদেশ উন্মোচন করেন নিপুণ দক্ষতায়। প্রায় অর্ধশতাব্দীর সাহিত্যচর্চায় তিনি উপহার দিয়েছেন অসংখ্য স্মরণীয় গল্প। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
শকুন, তৃষ্ণা, উত্তরবসন্তে, বিমর্ষ রাত্রি, প্রথম প্রহর, পরবাসী, আমৃত্যু, আজীবন, জীবন ঘষে আগুন, খাঁচা, ভূষণের একদিন, ফেরা, মন তার শঙ্খিনী, মাটির তলার মাটি, শোণিত সেতু, ঘরগেরস্থি, সরল হিংসা, খনন, সমুখে শান্তির পারাবার, অচিন পাখি, মা-মেয়ের সংসার, বিধবাদের কথা, সারা দুপুর, কেউ আসেনি—প্রভৃতি।
২০০৬ সালে প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস ‘আগুনপাখি’ বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য সংযোজন। দেশভাগ, নারীর জীবনসংগ্রাম ও ইতিহাসের নীরব বেদনা ধারণ করে উপন্যাসটি বর্ষসেরা উপন্যাসের স্বীকৃতি লাভ করে এবং পাঠকসমাজে ব্যাপক আলোড়ন তোলে।
২০২১ সালের ১৫ নভেম্বর রাজশাহী মহানগরীর নিজ বাসভবনে এই মহীরুহ কথাসাহিত্যিক ইহলোক ত্যাগ করেন। তবে তাঁর মৃত্যুতে সাহিত্য থেমে যায়নি—মানুষের জীবনসংগ্রামের যে অনন্ত কথকতা তিনি রেখে গেছেন, তা বাংলা সাহিত্যকে দীর্ঘদিন আলো দেখাবে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।