ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে জন মিলটন এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি শুধু একজন মহাকবি ছিলেন না; ছিলেন চিন্তাবিদ, গদ্যলেখক, রাজনৈতিক ভাষ্যকার এবং বাক্স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার এক আপসহীন প্রবক্তা। তাঁর সাহিত্যকর্মে যেমন মানবজীবনের গভীর দর্শন, ধর্মীয় বিশ্বাস, নৈতিকতা ও মানবিক চেতনার প্রতিফলন ঘটেছে, তেমনি তাঁর রাজনৈতিক লেখায় উচ্চারিত হয়েছে স্বাধীন চিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান।
১৬০৮ সালের ৯ ডিসেম্বর লন্ডনের ব্রেড স্ট্রিটে তাঁর জন্ম। বাবা জন মিলটন সিনিয়র ছিলেন একজন সংগীতজ্ঞ ও লেখক। শৈশব থেকেই সাহিত্য, সংগীত, দর্শন ও ধ্রুপদি ভাষার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ গড়ে ওঠে। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি লাতিন, গ্রিক, হিব্রু ও ইতালীয় ভাষাসহ বিভিন্ন ভাষায় অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন।
তাঁর সাহিত্যিক প্রতিভা, গভীর পাণ্ডিত্য এবং অসাধারণ কল্পনাশক্তি তাঁকে ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবির আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
আন্দোলন ও স্বাধীন চিন্তার সংগ্রাম
জন মিলটনের জীবন কেবল সাহিত্যচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর সময়ের ইংল্যান্ড ছিল রাজনৈতিক সংঘাত, ধর্মীয় বিরোধ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে উত্তাল। রাজতন্ত্রের কর্তৃত্ব, সংসদের ক্ষমতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে দেশজুড়ে সংঘাত ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছিল।
ইউরোপ ভ্রমণের সময় ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির খবর পেয়ে ১৬৩৯ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন। এরপর তিনি নিজের সাহিত্যিক মেধা ও লেখনীকে নিয়োজিত করেন রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামে।
তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য শুধু অস্ত্রের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন যুক্তি, চিন্তা ও সাহসী উচ্চারণেরও। তাই তাঁর অস্ত্র হয়ে উঠেছিল কলম।
১৬৪৪ সালে তিনি রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত গদ্যগ্রন্থ ‘Areopagitica’ (অ্যারিওপ্যাজিটিকা)। এটি ছিল প্রকাশনার ওপর পূর্বনিয়ন্ত্রণ বা সরকারি সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে এক অসাধারণ যুক্তিনির্ভর প্রতিবাদ। বই প্রকাশের আগে সরকারি অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতার বিরোধিতা করে তিনি মানুষের চিন্তা, মতপ্রকাশ ও মুদ্রণস্বাধীনতার পক্ষে শক্তিশালী অবস্থান তুলে ধরেন।
আজও বাক্স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং মুক্তবুদ্ধির আলোচনায় এই গ্রন্থের গুরুত্ব অপরিসীম।
ইংল্যান্ডের কমনওয়েলথ শাসনামলে তিনি সরকারের লাতিন সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সরকারি দায়িত্বের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে লেখালেখি অব্যাহত রাখেন। রাজতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁর জন্য কঠিন হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যান। কিন্তু থেমে যায়নি তাঁর সাহিত্যসাধনা।
প্যারাডাইস লস্ট : অন্ধকারের মধ্যেও অমর সৃষ্টির আলো
জন মিলটনের জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায় তাঁর অমর মহাকাব্য ‘Paradise Lost’ (প্যারাডাইস লস্ট) রচনা।
১৬৫২ সালের মধ্যে তিনি সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি হারান। অথচ এই শারীরিক অক্ষমতা তাঁকে সাহিত্যসাধনা থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। নিজের স্মৃতি, চিন্তাশক্তি ও কল্পনাকে সম্বল করে অন্যের সাহায্যে মুখে মুখে কবিতার পঙ্ক্তি আবৃত্তি করতেন। সহকারীরা সেগুলো লিখে রাখতেন। এভাবেই সম্পূর্ণ অন্ধ অবস্থায় তিনি সৃষ্টি করেন বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য।
১৬৫৮ থেকে ১৬৬৩ সালের মধ্যে মহাকাব্যটির মূল রচনার কাজ সম্পন্ন হয়। ১৬৬৭ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় ‘প্যারাডাইস লস্ট’। প্রথম সংস্করণে ছিল ১০টি খণ্ড। পরবর্তীতে ১৬৭৪ সালে প্রকাশিত দ্বিতীয় সংস্করণে এটি ১২টি খণ্ডে বিন্যস্ত হয়।
মহাকাব্যটির মূল উপজীব্য বাইবেলের আদিপুস্তকে বর্ণিত মানবজাতির আদি ইতিহাস। আদম ও হাওয়ার স্বর্গচ্যুতি, শয়তানের বিদ্রোহ, স্বর্গের দেবদূতদের সংঘাত, মানুষের প্রলোভন, পাপ ও পতনের মধ্য দিয়ে কবি তুলে ধরেছেন স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি, নৈতিকতা, বিশ্বাস, আনুগত্য এবং মানবজীবনের চিরন্তন দ্বন্দ্ব।
মিলটনের নিজের জীবনের রাজনৈতিক পরাজয়, ব্যক্তিগত হতাশা, অন্ধত্ব ও প্রতিকূলতার অভিজ্ঞতাও তাঁর এই মহাকাব্যের দর্শন ও আবেগকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
পাঁচ পাউন্ডে বিক্রি হয়েছিল অমর মহাকাব্যের স্বত্ব!
জন মিলটনের জীবনের একটি বিস্ময়কর ঘটনা হলো, বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই মহাকাব্যের প্রকাশস্বত্ব তিনি বিক্রি করেছিলেন মাত্র পাঁচ পাউন্ডের বিনিময়ে!
১৬৬৭ সালের ২৭ এপ্রিল প্রকাশক স্যামুয়েল সিমন্সের সঙ্গে তাঁর চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী তিনি প্রাথমিকভাবে পাঁচ পাউন্ড পান। প্রথম সংস্করণের নির্দিষ্টসংখ্যক কপি বিক্রি হলে আরও পাঁচ পাউন্ড এবং পরবর্তী সংস্করণগুলোর বিক্রির শর্ত পূরণ হলে অতিরিক্ত অর্থ পাওয়ার কথা ছিল।
প্রথম সংস্করণের বইয়ের দাম ছিল তিন শিলিং। ১৩০০ কপির প্রথম সংস্করণ বিক্রি হতে প্রায় দুই বছর সময় লেগেছিল। অথচ আজ সেই সামান্য পারিশ্রমিকে প্রকাশিত মহাকাব্যটি বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—তাঁর জীবদ্দশায় ‘প্যারাডাইস লস্ট’-এর প্রথম ও দ্বিতীয় সংস্করণ থেকে তিনি মোট ১০ পাউন্ড রয়্যালটি পেয়েছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী প্রকাশক স্যামুয়েল সিমন্সের কাছে বইটির স্বত্ব বিক্রি করেন আট পাউন্ডে।
প্যারাডাইস রিগেইনড ও স্যামসন অ্যাগনিস্টিস
‘প্যারাডাইস লস্ট’-এর অসাধারণ সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ১৬৭১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর আরও দুটি উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম—’Paradise Regained’ (প্যারাডাইস রিগেইনড) এবং ‘Samson Agonistes’ (স্যামসন অ্যাগনিস্টিস)।
প্রথমটিতে যিশুখ্রিষ্টের প্রলোভন জয় ও আত্মিক বিজয়ের কাহিনি তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে ‘স্যামসন অ্যাগনিস্টিস’ একটি ট্র্যাজেডি, যেখানে বাইবেলের চরিত্র স্যামসনের জীবন, পরাজয়, আত্মিক শক্তি ও আত্মত্যাগের বিষয়টি নাটকীয়ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
১৬৪৫ সালে প্রকাশিত তাঁর কবিতার সংকলনও পরবর্তীতে ১৬৭৩ সালে নতুনভাবে প্রকাশিত হয়। কবিতা ও গদ্য—উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর সাহিত্যিক দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়।
ব্যক্তিজীবনের শেষ অধ্যায়
রাজনৈতিক বিশ্বাস ও আদর্শের কারণে জীবনের শেষভাগে তাঁকে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর তিনি সরকারি দায়িত্ব হারান। এমনকি গ্রেপ্তার ও কারাবরণের শিকারও হন। পরবর্তীতে মুক্তি পেলেও জীবনের বাকি সময় কাটে অনেকটা নিভৃতে।
শারীরিক অন্ধত্ব, রাজনৈতিক পরাজয় ও আর্থিক সংকট—কোনো কিছুই তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে পরাজিত করতে পারেনি। বরং প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই তিনি হয়ে উঠেছিলেন আরও গভীর, আরও মননশীল একজন সাহিত্যস্রষ্টা।
১৬৭৪ সালের ৮ নভেম্বর, লন্ডনের নিজ বাসভবনে এই মহান কবির জীবনাবসান ঘটে বলে প্রচলিত জীবনীসূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তাঁকে লন্ডনের সেন্ট গাইলস ক্রিপলগেট গির্জায় তাঁর পিতার সমাধির পাশে সমাহিত করা হয়।
উত্তরাধিকার : সময়কে অতিক্রম করা এক মহাকবি
জন মিলটন কেবল ‘প্যারাডাইস লস্ট’-এর রচয়িতা নন; তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। মানুষের স্বাধীন চিন্তা, বিবেকের স্বাধীনতা, বাক্স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের অধিকারের পক্ষে তাঁর অবস্থান তাঁকে সাহিত্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে মানবসভ্যতার ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
তাঁর সাহিত্যকর্ম পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য কবি, সাহিত্যিক ও দার্শনিককে প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে ইংরেজি মহাকাব্যের ধারায় তাঁর অবদান অনন্য। অন্ধত্বের অন্ধকারে বসেও তিনি যে কল্পনার আলোকবর্তিকা জ্বালিয়েছিলেন, তা আজও বিশ্বসাহিত্যকে আলোকিত করে চলেছে।
একজন মানুষ চোখের আলো হারিয়েও কল্পনার আলোয় পৃথিবীকে আলোকিত করতে পারেন—জন মিলটন তারই এক অনন্য উদাহরণ।
তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, মানুষের প্রকৃত শক্তি তার শারীরিক সামর্থ্যে নয়; বরং তার চিন্তা, আদর্শ, সৃজনশীলতা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে।
মহাকবি জন মিলটনের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।



