স্মরণ কবি-প্রাবন্ধিক তারাপদ রায়

হাস্যরস, ব্যঙ্গ ও জীবনের গভীর বোধের এক অনন্য কবি

বাংলা সাহিত্যের আকাশে কিছু কবি আছেন, যাঁদের কবিতায় বিষণ্নতার মধ্যেও হাসির আলো জ্বলে, ব্যঙ্গের আড়ালেও জীবনের গভীর সত্য উচ্চারিত হয়। কবি তারাপদ রায় তেমনই এক স্বতন্ত্র সাহিত্যপ্রতিভা—কবি, প্রাবন্ধিক, রসস্রষ্টা এবং শিশুসাহিত্যিক হিসেবে যিনি বাংলা সাহিত্যে নিজের জন্য নির্মাণ করেছিলেন এক অনন্য আসন।

১৯৩৬ সালের ১৭ নভেম্বর টাঙ্গাইলে তাঁর জন্ম। শৈশবের শিক্ষাজীবন কাটে টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ম্যাট্রিক পাস করে ১৯৫১ সালে তিনি কলকাতায় চলে যান। কলকাতার সেন্ট্রাল ক্যালকাটা কলেজ—বর্তমানে মৌলানা আজাদ কলেজ—থেকে অর্থনীতিতে পড়াশোনা করেন। কর্মজীবনের শুরুতে উত্তর ২৪ পরগণার হাবড়ার একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতাও করেছেন।

সাহিত্যজগতে তারাপদ রায়ের আবির্ভাব ছিল স্বতন্ত্র স্বরের এক উজ্জ্বল সংযোজন। তিনি শুধু কবিতাই লিখতেন না; সম্পাদনা করেছেন ‘পূর্বমেঘ’, ‘কয়েকজন’সহ বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকা। ‘নক্ষত্র রায়’ ও ‘গ্রন্থকীট’ ছদ্মনামেও তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে।

১৯৫৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘তোমার প্রতিমা’। এরপর একে একে প্রকাশিত হয়— ‘ছিলাম ভালোবাসার নীল পতাকাতে স্বাধীন’, ‘কোথায় যাচ্ছেন তারাপদ বাবু’, ‘নীল দিগন্ত এখন ম্যাজিক’, ‘পাতা ও পাখিদের আলোচনা’, ‘ভালোবাসার কবিতা’, ‘দারিদ্র্যরেখা’, ‘দুর্ভিক্ষের কবিতা’, ‘জলের মতো কবিতা’, ‘দিন আনি দিন খাই’, ‘টিউবশিশুর বাবা’, ‘ভালো আছো গরিব মানুষ’, ‘কবি ও পরশিল্পী’—সহ অসংখ্য কাব্যগ্রন্থ।

তাঁর গদ্যেও ছিল একই রকম স্বাতন্ত্র্য ও রসবোধ। ‘কাণ্ডজ্ঞান’, ‘জ্ঞানগম্যি’, ‘ডোডো তাতাই পালাকাহিনী’, ‘স্বনির্বাচিত তারাপদ রায়’, ‘ছাড়াবাড়ি পোড়াবাড়ি’, ‘বালিশ’ প্রভৃতি গ্রন্থ তাঁর বহুমাত্রিক সাহিত্যপ্রতিভার পরিচয় বহন করে।

তারাপদ রায়ের কবিতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর নিজস্ব কথাভঙ্গি। সহজ-সরল ভাষার ভেতর দিয়ে তিনি জীবনের জটিলতা, মানুষের অসহায়ত্ব, সমাজের অসংগতি এবং মধ্যবিত্ত জীবনের নানা হাসি-কান্নাকে তুলে ধরেছেন। পরিহাস, ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ ও গভীর জীবনবোধকে একসূত্রে গেঁথে তিনি বাংলা কবিতায় সৃষ্টি করেছিলেন এক স্বতন্ত্র বাকভঙ্গি। তাঁর হাসি কখনো নিছক হাসি নয়—তার অন্তরালে লুকিয়ে থাকে বিষাদ, ক্ষত, অভিমান কিংবা সমাজবাস্তবতার নির্মম কোনো সত্য।

শিশুসাহিত্যেও তাঁর অবদান স্মরণীয়। বিশেষ করে ‘ডোডো তাতাই’ তাঁর সৃজনশীল প্রতিভার এক উজ্জ্বল নিদর্শন। শিশুমনের কৌতূহল, আনন্দ ও কল্পনার জগৎকে তিনি তাঁর নিজস্ব রসবোধে প্রাণবন্ত করে তুলেছিলেন।

সাহিত্যকীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লাভ করেন শিরোমণি পুরস্কার ও কথা পুরস্কার। তবে পুরস্কার-সম্মানের চেয়েও বড় ছিল তাঁর লেখার প্রতি আজীবন নিষ্ঠা। জীবনের শেষ প্রান্তেও কলম তাঁর হাত ছাড়েনি। হাসপাতালের শয্যায় শুয়েও তিনি লিখে গেছেন—যেন শব্দই ছিল তাঁর জীবনস্পন্দন, আর কলম ছিল মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও জীবনের কাছে ফিরে যাওয়ার এক অবিনশ্বর পথ।

২০০৭ সালের ২৫ আগস্ট তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। আজ তাঁর প্রয়াণের দিন। সময় চলে যায়, মানুষ চলে যায়, কিন্তু প্রকৃত সাহিত্যিকের শব্দ কখনো মরে না। তারাপদ রায়ের কবিতার সেই নির্মল হাসি, তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ, মৃদু বিষাদ আর জীবনের প্রতি গভীর মমতা আজও বাংলা সাহিত্যের পাঠককে ভাবায়, হাসায় এবং কখনো নিঃশব্দে কাঁদায়।

তারাপদ রায় তাই শুধু একজন কবির নাম নয়—তিনি বাংলা কবিতার এক স্বতন্ত্র স্বর, রসবোধের এক অসামান্য শিল্পী এবং জীবনের অন্তর্গত বেদনার এক মৃদুভাষী কথক।

প্রয়াণদিবসে এই অনন্য কবি ও রসস্রষ্টার প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

শ্রদ্ধাঞ্জলি।

 

Tags :

ratul Khaborwala

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।