খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ই জুলাই ২০২৬, ৮:৪১ এএম
বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে যে কজন ব্যক্তিত্ব তাঁদের প্রজ্ঞা, সততা ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন, হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী তাঁদের অন্যতম। তিনি ছিলেন একজন বরেণ্য কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের উজ্জ্বল মুখ এবং জাতীয় সংসদের একজন মর্যাদাবান স্পিকার।
১৯২৮ সালের ১১ নভেম্বর সিলেটে তাঁর জন্ম। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তিনি ছিলেন মেধার স্বাক্ষরবাহী। ১৯৪৭ সালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। সেখানে আইনশাস্ত্র অধ্যয়ন করে লন্ডনের ইনার টেম্পল-এর সদস্যপদ লাভ করেন। পাশাপাশি লন্ডন ইনস্টিটিউট অব ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে ডিপ্লোমা অর্জন করেন। পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লেচার স্কুল অব ল’ অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি থেকেও উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন, যা তাঁর কূটনৈতিক জীবনের দৃঢ় ভিত্তি নির্মাণ করে।
১৯৫৩ সালে তিনি পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে যোগ দেন। কর্মজীবনে রোম, বাগদাদ, প্যারিস, লিসবন ও জাকার্তাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মিশনে দায়িত্ব পালন করে তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করে বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ান। দিল্লিতে বাংলাদেশ মিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে বিশ্বজনমত গঠন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে তিনি অসামান্য ভূমিকা রাখেন। মুক্তিযুদ্ধের সেই অধ্যায়ে তাঁর কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও দেশপ্রেম ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।
স্বাধীনতার পর তিনি জার্মানি, সৌদি আরব এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও শক্তিশালী ভিত্তি দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তাঁর কূটনৈতিক জীবনের সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আসে ১৯৮৬ সালে, যখন তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। এটি ছিল বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক গৌরবের মুহূর্ত এবং বিশ্ব কূটনীতিতে তাঁর অসামান্য গ্রহণযোগ্যতার উজ্জ্বল স্বীকৃতি।
১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নিরপেক্ষতা, শালীনতা এবং সংসদ পরিচালনার দক্ষতা আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় তাঁর অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়াভিত্তিক উইলিয়াম অ্যান্ড মেরি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘মহাত্মা গান্ধী শান্তি পুরস্কার’ প্রদান করে। এছাড়া তিনি লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ-এর সদস্য ছিলেন।
২০০১ সালের ১০ জুলাই এই প্রজ্ঞাবান কূটনীতিক, দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক এবং নির্ভেজাল দেশপ্রেমিক পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।
তাঁর কর্ম, প্রজ্ঞা, সততা এবং বাংলাদেশের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় অসামান্য অবদান জাতির ইতিহাসে চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি, হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।
আপনার দেশপ্রেম, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা এবং রাষ্ট্রচিন্তা আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
মন্তব্য