মনজুর রশীদ বিদ্যুৎ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৩ মার্চ ২০২৫
সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র হিসাবে অনার্সে আমাদের একটা কোর্স ছিল যার নাম ‘ক্রিমিনোলজি’ বা অপরাধ বিজ্ঞান। এই বিজ্ঞান পড়তে গিয়েই প্রথম পরিচয় ঘটে হোয়াইট কলার ক্রাইমের সাথে। সাদারল্যান্ড নামক একজন মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী এই ধারণার প্রবক্তা। যদিও এমন অপরাধের আইনগত কোন সংজ্ঞা নেই। বাংলা শব্দে এটা ‘ভদ্রবেশী অপরাধ’ হিসেবে বিবেচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এর উৎপত্তি হলেও ক্রমে তা বিভিন্ন রাষ্ট্রে বিস্তৃত পরিসরে লক্ষ্য করা যায়। সাদারল্যান্ড তার অভিজ্ঞতা থেকে বলেন – হোয়াইট কলার ক্রিমিনালরা সাধারণ অপরাধীদের তুলনায় অধিকতর বুদ্ধিমান, আচরণে ভারসাম্যপূর্ণ, কর্মজীবনে কৃতকার্য এবং সমাজে উঁচু পদমর্যাদার অধিকারী। তাদের প্রদত্ত অপরাধ অপ্রত্যক্ষ, নৈর্ব্যক্তিক এবং ছদ্মনামে সংঘটিত হয় বলে অপরাধবিজ্ঞানীরা সহমত পোষণ করেন। তাদের মতে, এসব ভদ্রবেশী অপরাধীর কৃতকর্ম সহজে সাধারণের দৃষ্টিগোচর হয়না। অথচ, হোয়াইট কলার ক্রিমিনালদের অপরাধের অর্থনৈতিক ফলাফল অন্যান্য সাধারণ অপরাধের তুলনায় অনেক গুণ বেশী। অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির চেয়ে সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও ব্যাপক এবং সুদূরপ্রসারী। কারণ এরা মানুষের বিশ্বাস ভঙ্গ করে। ফলে অবিশ্বাসের জন্ম হয়। এতে করে বিস্তৃত পরিসরে সামাজিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। যা রাষ্ট্রের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলে।
সমাজতাত্ত্বিক ও মানসিক বৈকল্যের কারণে মানুষ অপরাধ করে – এই গতানুগতিক ব্যাখ্যা পক্ষপাতদুষ্ট নমুনার ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়াকে অকার্যকর অভিহিত করে হোয়াইট কলার অপরাধের যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়। আর্থ-সামাজিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিগণও যে অপরাধের ঊর্ধ্বে এমন ভ্রান্ত ধারণাকে অস্বীকার করেন অপরাধবিজ্ঞানীরা। গতানুগতিক ব্যাখ্যায় কেবল মাত্র নিম্নশ্রেণির লোকেরাই অপরাধ করে, এমন ধারণাকে তিরস্কার করা হয়। উচ্চ আর্থ-সামাজিক শ্রেণীভুক্ত কোন ব্যক্তি যদি পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে দণ্ডবিধি আইনের পরিপন্থী কর্মকান্ড করে থাকেন তবে তা হবে হোয়াইট কলার ক্রিমিনালের অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু এসব অপরাধ প্রতারণার সামিল এবং জনস্বার্থের পরিপন্থী। এ জন্যে আইনে শাস্তির ব্যবস্থা থাকলেও হোয়াইট কলার ক্রিমিনালরা আইনের প্রতিই প্রকারান্তরে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে চলেন। পাঠক বন্ধুদের হয়তো মনে হতে পারে হঠাৎ এ বিষয় নিয়ে এতো কথা কেনো?
এর প্রধান কারণ হল এ জাতীয় অপরাধীদের অস্তিত্ব আমরা কম-বেশি উপলব্ধি করলেও এর ব্যাপকতা আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এতোটাই বিস্তৃত হয়ে গেছে যে, সম্ভবত হোয়াইট কলার ক্রিমিনালের প্রবক্তারাও হয়তো কখনো এতোটা কল্পনা করেননি। এ জাতীয় অপরাধ বুড়ো থেকে শুরু করে যুব সমাজেও এখন তা ভয়ংকর ভাইরাস হয়ে ছড়িয়ে গেছে। যেভাবে প্রতিদিন তথাকথিত সুন্দর সৌম্য চেহারার অনেক সিনিয়র মানুষ যারা কেউ ছিলেন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, উচ্চপদস্থ আমলা, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, সমাজকর্মী – যাদেরকে সবাই দেশ, জাতি ও সমাজের বিবেক বা আদর্শ বলে মনে করতো, ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে মুখোশের আড়ালে তাদের আসল চেহারা। ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থ চরিতার্থ করতে তারা এমন কোন অনাচার নাই যা করতে বাকি রেখেছে। ঘুষ, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে দেশের কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার থেকে শুরু করে মানুষ খুন, নারী অপহরণ, ধর্ষণ, অন্যের জমি, বাড়িঘর ও সম্পত্তি দখল, চাঁদাবাজি, নানাভাবে মানুষকে জিম্মি করে প্রচুর অর্থ আদায়, অবৈধভাবে প্রাসাদোপম নতুন নতুন অসংখ্য বাড়ি, ফ্ল্যাট, রিসোর্ট আর বিলাসবহুল কোটি কোটি টাকা মূল্যের গাড়ির মালিক বনে যাওয়া, বাজার সিন্ডিকেট বানিয়ে নেপথ্যে থেকে নিত্য পণ্যসামগ্রী চড়ামূল্যে কিনতে মানুষকে বাধ্য করা, ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ ও ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে নিরীহ অসংখ্য মানুষকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে তার পুরো পরিবারের সর্বনাশ ঘটানো – এমন কিছু নেই যা তারা বাদ রেখেছে।
সবচেয়ে দুঃখজনক হল এগুলো এখন তরুণদের মাঝেও সংক্রামিত হয়েছে। সকলের হয়তো মনে আছে বুয়েটে অধ্যায়নরত একদল মেধাবী নষ্ট তরুণ রাজনৈতিক ছত্রছায়া একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আরেক মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে ঠান্ডা মাথায় দীর্ঘ ৬/৭ ঘন্টা ধরে যেভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছিলো, অথচ তাদের চেহারাগুলোতে ছিল নাটক-সিনেমা-উপন্যাসে উপস্থাপিত তথাকথিত ভদ্র ও নায়কোচিত চেহারার ছাপ। অত্যন্ত ভদ্রবেশী এই ছেলেগুলো এতো নির্মম একটা লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পরও একসাথে রাতের খাবার খেয়েছে, টিভিতে ফুটবল খেলা দেখেছে এবং বিন্দুমাত্র কারো ভেতর তখন কোনো অনুশোচনার ছাপ দেখা যায়নি! একই ঘটনা ঘটেছিলো বিগত বছরে জুলাই- আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার অভ্যুদয়ের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদুল্লাহ হলে চোর সন্দেহে তোফাজ্জল নামক এক সাধারণ তরুণকে হলের ক্যান্টিনে পেট ভরে ভাত খাইয়ে এই হলেরই তথাকথিত মেধাবী ছাত্রদের দ্বারা ঠান্ডা মাথায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা । কিভাবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জঙ্গী ও শীর্ষ সন্ত্রাসীর প্লট তৈরি করে ক্রসফয়ারে হত্যা করে এসে হত্যাকারী উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের মিডিয়ার সামনে নিজেদেরকে সাধু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা।
ক্রমশ বের হয়ে আসছে কিভাবে জুলাই-আগস্ট এর আন্দোলনের সময় কে কিভাবে উপর-নীচ থেকে প্রাণঘাতী অস্ত্র, সামরিক রাইফেল ও শটগানের গুলিতে আন্দোলনরত সহ নিরীহ শিশু-কিশোর- তরুণ-জনতাকে হত্যার সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন। অথচ মিডিয়ার সামনে এসে সে কি মায়াকান্না! একবিংশ শতাব্দীর এই অত্যাধুনিক যুগে এসেও শুনতে হচ্ছে গুয়াতনামার কারাগারের চেয়েও কোন অংশে কম নয়, গুম হওয়া ব্যক্তিদের জন্য এমন আয়নাঘরের কথা!
এবার ফিরে আসি শুরুর আলোচনায়। হোয়াইট কলার ক্রাইম সমাজের জন্য যেমন অত্যন্ত ক্ষতিকর, তারচেয়েও আরও ভয়ংকর এই ভদ্রবেশী ক্রিমিনালরা। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থেকে এরা ভদ্রবেশে কিভাবে কি মাত্রায় অপরাধ সংঘটিত করে থাকে উল্লেখিত বেশিরভাগ ঘটনা তার অন্যতম উদাহরণ। নিজেদের অপকর্মকে বৈধতা দিতে এরা সুকৌশলে নানা ধরনের ছলনার আশ্রয় নেয়। যেমন- মেধাবী আবরারকে শিবিরকর্মী হিসাবে কালিমা লেপ্টে দিয়ে নির্দয়ভাবে তাকে পিটিয়ে হত্যা করলো। অথচ তার পড়ার টেবিলে পাওয়া গেছে ক্রাচের কর্নেল, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, মিসির আলি সমগ্র ইত্যাদি নামের নানা বই সমগ্র। আর তাকে হত্যাকারী শেখ মুজিবের আদর্শের সৈনিক পরিচয় দানকারীদের পড়ার টেবিলে পাওয়া গেছে মদের বোতল, অত্যাচার করার জন্য নানারকম দেশীয় যন্ত্রপাতি।
তথাকথিত মেধাবী, উচ্চ মর্যাদার অধিকারী, সুশিক্ষিত ও প্রমাণিত এসব অপরাধীদের চরম শাস্তি দ্রুত নিশ্চিত করা না গেলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ যে সবসময়ের জন্যই মারাত্মক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে – তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখেনা।
লেখকঃ সমাজ বিশ্লেষক, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী (মনজুর রশীদ বিদ্যুৎ)।
খবরওয়ালা/এসআর