খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 1শে শ্রাবণ ১৪৩২ | ১৬ই জুলাই ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণায় দেশের পোশাক শিল্পে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ চরমে উঠেছে। প্রস্তাবিত এই পাল্টা শুল্ক (Reciprocal Tariff) কার্যকর হলে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারাতে পারে বাংলাদেশ, এমন শঙ্কা করছেন উদ্যোক্তা ও বিশ্লেষকরা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এখনো ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে গেলেও তৃতীয় দফা বৈঠকের পরও স্পষ্ট অগ্রগতি হয়নি। ফলে ছোট ও মাঝারি পোশাক কারখানাগুলোর সামনে অচলাবস্থার আশঙ্কা প্রকট হচ্ছে। বিজিএমইএ বলছে, বাড়তি শুল্ক কার্যকর হলে সহস্রাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যেখানে প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক কাজ করছেন।
পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা জানান, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো এই বাড়তি শুল্ক চাপ সামাল দিতে পারবে না। এ ধরনের কারখানার সংখ্যা ১,১৫০-এর বেশি, যেগুলোতে গড়ে সাতশ থেকে এক হাজার শ্রমিক নিয়োজিত আছেন। অতিরিক্ত শুল্কের কারণে এসব প্রতিষ্ঠান নতুন অর্ডার পাবে না, ফলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। এতে চাকরি হারাবেন লাখ লাখ শ্রমিক, যাঁদের বড় একটি অংশ নারী।
যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ২২ শতাংশ কমে ৫২ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, ১ আগস্ট থেকে ৩৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে আগামি মাসগুলোতে রপ্তানি আরও ভয়াবহভাবে কমে যেতে পারে।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, “শুল্ক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষির জন্য সরকারের লবিইস্ট নিয়োগ করা উচিত।” তবে সরকারি পর্যায়ে এ বিষয়ে এখনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, “আলোচনা ভালোভাবে এগোচ্ছে। কিন্তু শুধু বাণিজ্য আলোচনায় কাজ হবে না, এখানে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত জরুরি।”
তাঁদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘নন-ডিসক্লোজার’ চুক্তি বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে আছে। ফলে দর-কষাকষির সুযোগও সীমিত হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের বড় প্রতিযোগী ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ২০ শতাংশ শুল্কে রপ্তানির সুযোগ পেয়েছে। পাকিস্তান ২৯ শতাংশ শুল্ক থাকলেও ১০ শতাংশে নামিয়ে আনতে চেষ্টা করছে। সেই তুলনায় বাংলাদেশের ৩৫ শতাংশ হার বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। অথচ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত একাই দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি এবং প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে।
গত ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ৬০টি দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়, যেটি ৯ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত ছিল। ৮ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অধ্যাপক ড. ইউনূসকে পাঠানো এক চিঠিতে ১ আগস্ট থেকে বাংলাদেশি পণ্যে ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন।
এই সংকট সামাল দিতে বাংলাদেশ সরকার ‘জিটুজি’ ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তিন লাখ টন গম আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে বোয়িং বিমান কেনা, তুলা, গ্যাস টারবাইন, সেমিকন্ডাক্টর ও চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক সমন্বয়ের বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ২০২৪ সালে ৮৪০ কোটি ডলার, এর মধ্যে ৭৩৪ কোটি ডলারই তৈরি পোশাক। অথচ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে আমদানি মাত্র ২২০ কোটি ডলার। তবুও বাণিজ্য ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশকে ৩৫ শতাংশ শুল্কের আওতায় আনা হয়েছে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক আশিকুর রহমান তুহিন বলেন, “যদি দর-কষাকষির মাধ্যমে শুল্ক হার কমানো যায়, তাহলে বাজারটিতে নতুন রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি হবে। কিন্তু তা সম্ভব না হলে ধীরে ধীরে এই বাজার হারিয়ে যাবে, যা অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।”
খবরওয়ালা/এমএজেড