আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসির সব শাখা ও এটিএম বুথে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকটির আমানতকারীরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবে অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘদিনের তারল্যসংকটের মধ্যে এই উদ্যোগকে গ্রাহকদের আস্থা ফেরানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবীন এবং ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল হক সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে ব্যাংকটির সামগ্রিক তারল্য পরিস্থিতি, আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলনের সক্ষমতা এবং ব্যাংকের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
সাক্ষাতে গভর্নর আমানতকারীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা দেন। একই সঙ্গে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা অক্ষুণ্ন রাখা এবং ন্যাশনাল ব্যাংকের কার্যক্রম সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন তিনি। বিশেষ করে কোনো আমানতকারী যেন প্রয়োজনের সময় নিজের অর্থ উত্তোলনে সমস্যায় না পড়েন, তা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান বৈঠকে জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে ব্যাংকটির পরিচালনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকের দক্ষতা ও কার্যক্ষমতা বাড়াতে ঋণ ব্যবস্থাপনায়ও পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. হাবিবুর রহমান, মো. কবির আহমাদ, মো. সরোয়ার হোসেন ও মো. আনিছুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
ন্যাশনাল ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে নানা আর্থিক চাপে রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ দীর্ঘদিন সিকদার গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপের পর পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আসে এবং ব্যাংকটির ওপর থেকে সিকদার গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ সরে যায়। বর্তমানে মাল্টিমোড গ্রুপ, হোসাফ গ্রুপ ও আর্মানা গ্রুপের পরিবারের সদস্যরা ব্যাংকটির পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
তবে পরিচালনা কাঠামোয় পরিবর্তন এলেও পুরোনো আর্থিক সমস্যাগুলো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি ব্যাংকটি। উচ্চ খেলাপি ঋণ, দীর্ঘদিনের লোকসান এবং তারল্যসংকট এখনো ন্যাশনাল ব্যাংকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংকের মোট ঋণের ৫৬ দশমিক ৪৪ শতাংশই খেলাপি। এসব খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকটির নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতি রয়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ ব্যাংকটির আয় ও তারল্য ব্যবস্থাপনার ওপরও চাপ তৈরি করছে।
এ ছাড়া ২০২২ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে লোকসান করছে ন্যাশনাল ব্যাংক। ২০২৪ সালে ব্যাংকটির লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা। চলতি বছরও লোকসানের ধারা অব্যাহত রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলনের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে ১৫ অক্টোবর থেকে ব্যাংকটির সব শাখা ও এটিএম বুথে প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে একদিকে আমানতকারীদের তাৎক্ষণিক অর্থের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে ব্যাংকটির স্বাভাবিক লেনদেন কার্যক্রমও ধীরে ধীরে স্থিতিশীল করার সুযোগ তৈরি হবে।
ব্যাংকিং খাতে কোনো প্রতিষ্ঠানের তারল্যসংকট দেখা দিলে আমানতকারীদের মধ্যে অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। তাই ন্যাশনাল ব্যাংকের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নগদ অর্থের জোগান নিশ্চিত করার পাশাপাশি খেলাপি ঋণ কমানো, সঞ্চিতির ঘাটতি পূরণ এবং লোকসান কাটিয়ে ওঠার মতো দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংস্কারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


