বিদায়ী অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকারী নোটে দেশের আর্থিক খাত সংস্কার নিয়ে বিস্তৃত ও কাঠামোগত পরামর্শ তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর মূল প্রস্তাব হলো—বাংলাদেশ ব্যাংকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং কার্যক্রমের বাইরে থাকা নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি দায়িত্ব আলাদা একটি স্বতন্ত্র সংস্থার কাছে ন্যস্ত করা। এতে স্বার্থের সংঘাত কমবে, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে এবং আর্থিক খাত আরও শক্ত ভিত্তি পাবে বলে তিনি মত দিয়েছেন।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক একদিকে মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে, অন্যদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ-তদারকি করে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একই প্রতিষ্ঠানের হাতে নীতি প্রণয়ন ও তদারকি ক্ষমতা থাকলে কার্যকারিতা ও নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এ প্রেক্ষাপটে বিদায়ী উপদেষ্টা প্রস্তাব করেছেন একটি পৃথক তদারকি সংস্থা গঠনের, যা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে বিশেষায়িতভাবে কাজ করবে।
তিনি উল্লেখ করেন, দেশে ব্যাংকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর চাপও বেড়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষার মতো মৌলিক দায়িত্বে আরও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
বিভিন্ন দেশে ব্যাংক তদারকি কাঠামো
| দেশ |
তদারকি কাঠামো |
| যুক্তরাষ্ট্র |
পৃথক তদারকি সংস্থা বিদ্যমান |
| যুক্তরাজ্য |
পৃথক নিয়ন্ত্রক সংস্থা কার্যকর |
| জাপান |
আলাদা তদারকি কর্তৃপক্ষ |
| ভারত |
কেন্দ্রীয় ব্যাংকই তদারকি করে |
| ফিলিপাইন |
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনে তদারকি |
উত্তরাধিকারী নোটে আরও প্রস্তাব করা হয়েছে—ব্যাংক রেজোল্যুশন কর্তৃপক্ষ গঠন, আমানত সুরক্ষা করপোরেশন প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামি ব্যাংকিংয়ের জন্য পৃথক আইন প্রণয়ন। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন, আমানতকারীর স্বার্থ সংরক্ষণ এবং শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অগ্রাধিকার
নোটে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় কয়েকটি তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকারের কথা বলা হয়েছে—
-
রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি
-
বাজারভিত্তিক বিনিময় হার অব্যাহত রাখা
-
উচ্চ অগ্রাধিকার উন্নয়ন প্রকল্পে মনোযোগ
-
উচ্চ সুদের ঋণ গ্রহণে সংযম
-
ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ ও অপচয় রোধ
উল্লেখ করা হয়েছে, গত এক দশকে পুঞ্জীভূত মূল্যস্ফীতি বেড়েছে প্রায় ১১১ শতাংশ। এ পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান রক্ষায় নতুন বেতনকাঠামো প্রণয়ন প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে সমন্বিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, দেশে কর ফাঁকি ও কর অব্যাহতির সংস্কৃতি ব্যাপক। আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর ব্যবস্থায় যথেষ্ট ডিজিটাল সক্ষমতা নেই। কর আদায়ে ন্যায্যতা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, বিদায়ী অর্থ উপদেষ্টার মতে, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া অর্থনীতি টেকসইভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। নতুন সরকারের জন্য এ নোট একটি নীতিগত দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করতে পারে।