খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
আজকের প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে যেসব দেশ সেমিকন্ডাক্টর বা চিপের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখে, তারা অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে থাকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি, স্বয়ংক্রিয় ড্রোন ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি—সব ক্ষেত্রেই সেমিকন্ডাক্টরই মূল ভিত্তি। আন্তর্জাতিক বাজারের সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজার আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু এই খাতে দক্ষ জনবলের অভাব বিশেষ চিন্তার বিষয়।
বাংলাদেশের পক্ষে এ পরিস্থিতি কৌশলগত সুযোগ তৈরি করছে। যথাযথ পরিকল্পনা ও শিক্ষার মাধ্যমে দেশের প্রকৌশলীরা এই শিল্পে প্রবেশ করতে পারে। তবে সফল হওয়ার জন্য তিনটি মূল দিক অপরিহার্য—শিক্ষাগত ভিত্তি, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং হাতে-কলমে বাস্তব অভিজ্ঞতা।
১. নির্দিষ্ট ট্র্যাক নির্বাচন: একসঙ্গে সব শিখার চেষ্টা না করে একটি বিশেষ ক্ষেত্র বেছে নেওয়া জরুরি। ডিজিটাল ভিএলএসআই, ভেরিফিকেশন, ফিজিক্যাল ডিজাইন, অ্যানালগ/মিক্সড-সিগন্যাল বা পাওয়ার ইলেকট্রনিক্সের কোনো একটি ট্র্যাক নির্বাচন করুন।
২. মৌলিক জ্ঞান অর্জন: সেমিকন্ডাক্টর ফিজিকস, সিএমওএস, ভিএলএসআই ডিজাইন, পাইথন ও লিনাক্সের জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।
৩. প্রকল্পভিত্তিক অভিজ্ঞতা: আরটিএল ব্লক ডিজাইন, সিমুলেশন রিপোর্ট তৈরি, ডকুমেন্টেশন লেখা এবং গিটহাবে প্রকাশ—এসব অভিজ্ঞতা বিদেশে চাকরি বা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে রাখে।
বর্তমানে ওপেন-সোর্স টুলের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ছোট ছোট চিপ ডিজাইন ফ্লো সম্পন্ন করতে পারছে, যা দশ বছর আগে সম্ভব ছিল না। সিজিপিএ নয়, প্রকল্পভিত্তিক অভিজ্ঞতাই সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে পেশাদারদের মূল মূল্য।
নিচের টেবিলে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের চারটি প্রধান স্তর ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা তুলে ধরা হলো:
| খাত | কার্যক্রম | বাংলাদেশের সম্ভাবনা | প্রয়োজনীয় সম্পদ ও বিনিয়োগ | লক্ষ্য সমূহ |
|---|---|---|---|---|
| চিপ ডিজাইন (ফ্যাবলেস) | আরটিএল ডিজাইন, ভেরিফিকেশন, ফিজিক্যাল ডিজাইন, অ্যানালগ/মিক্সড-সিগন্যাল ডিজাইন | উচ্চ; দ্রুত প্রবেশযোগ্য | কম; মূলত সফটওয়্যার ও দক্ষ জনবল | আইসি ডিজাইন, সিস্টেম লেভেল সমাধান |
| টেস্টিং ও প্যাকেজিং (ওএসএটি/এটিপি) | চিপ টেস্টিং, প্যাকেজিং | মধ্যম; বিনিয়োগ কম | ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল, ইন্ডাস্ট্রিয়াল দক্ষতা | কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, দ্রুত প্রবেশ |
| ডিভাইস ও প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং | ফটোলিথোগ্রাফি, ডিপোজিশন, এচিং, আয়ন ইমপ্লান্টেশন | নিম্ন; দীর্ঘমেয়াদি | অত্যধিক; বিলিয়ন ডলারের ফ্যাব প্রয়োজন | ফ্যাব স্থাপনা, উচ্চ প্রযুক্তি দক্ষতা |
| ইকুইপমেন্ট ও ম্যাটেরিয়াল | লিথোগ্রাফি সিস্টেম, প্লাজমা এচিং, বিশেষায়িত গ্যাস, সিলিকন ওয়েফার | সীমিত; প্রযুক্তিনির্ভর | অত্যধিক | উচ্চমানের যন্ত্রপাতি ও উপকরণ |
পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ফ্যাব স্থাপন বাংলাদেশের জন্য আপাতত বাস্তবসম্মত নয়। তাই মানবসম্পদ তৈরি ও দক্ষ প্রকৌশলী প্রস্তুতিই এখন প্রধান লক্ষ্য। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা ল্যাব, পাইলট লাইন ও ছোট প্রোটোটাইপিং সুবিধা স্থাপন করতে হবে, যা শুধু পাঠ্যক্রম নয়, বরং শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রদান করবে। বর্তমান ডিজাইন-ভিত্তিক উদ্যোগগুলো একাডেমিয়ার সঙ্গে কাজ করলে শিক্ষার্থীরা ইন্টার্নশিপ, যৌথ গবেষণা ও প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষ হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশ সঠিক পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতিশীল শিক্ষার্থী ও প্রকৌশলীর মাধ্যমে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে দ্রুত এবং সফলভাবে প্রবেশ করতে পারে, যা দেশকে প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী করে তুলবে।