খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরান ও পশ্চিমা জোটের মধ্যকার উত্তেজনা এখন চরম শিখরে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যৌথ সামরিক অভিযানের প্রেক্ষিতে ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে সকল প্রকার জাহাজ চলাচল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘তাসনিম নিউজ’-এর বরাতে জানা গেছে, ইরানের ইসলামি রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ভিএইচএফ (VHF) বেতার বার্তার মাধ্যমে ওই এলাকায় অবস্থানরত জাহাজগুলোকে এই জলপথ ব্যবহার না করার কড়া নির্দেশ দিয়েছে। যদিও ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এখনো কোনো লিখিত বিবৃতি দেয়নি, তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌ মিশন ও রয়টার্সের তথ্যানুযায়ী, বাস্তবে এই রুটটি এখন অবরুদ্ধ।
হরমুজ প্রণালি কেবল একটি সামুদ্রিক পথ নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণভোমরা। ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপরীতে ইরানের উপকূলে অবস্থিত এই সরু জলপথটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর হয়ে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্বের সিংহভাগ জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশ—সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এই পথেই তাদের পণ্য বিশ্ববাজারে পাঠায়। এছাড়া বিশ্বের শীর্ষ এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ কাতারও এই রুটের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।
নিচে হরমুজ প্রণালি অবরোধের সম্ভাব্য বৈশ্বিক প্রভাবের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো:
| প্রভাবের ক্ষেত্র | বর্তমান ও সম্ভাব্য চিত্র | অর্থনৈতিক ফলাফল |
| জ্বালানি তেল সরবরাহ | দৈনিক প্রায় ২ কোটি ব্যারেল (বিশ্বের ২০%)। | বাজারে তীব্র সরবরাহ ঘাটতি ও হাহাকার। |
| তেলের বাজারমূল্য | বর্তমান দাম ৭৩-৮০ ডলার। | গোল্ডম্যান স্যাকসের মতে ১০০ ডলার ছাড়াবে। |
| এলএনজি পরিবহন | বৈশ্বিক চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ। | বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ও শিল্প উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি। |
| শিপিং বীমা ও ব্যয় | ঝুঁকি বিবেচনায় বীমা প্রিমিয়াম বৃদ্ধি। | আমদানিকৃত সকল পণ্যের খুচরা মূল্য বৃদ্ধি। |
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালি যদি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তবে বৈশ্বিক অর্থনীতি এক গভীর মন্দার কবলে পড়বে। গোল্ডম্যান স্যাকস এবং ভারতের ইকুইরাস সিকিউরিটিজের মতো বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বাভাস দিচ্ছে যে, অপরিশোধিত তেলের দাম অনায়াসেই ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলার পর্যন্ত উঠে যেতে পারে। এর ফলে পরিবহন খাত থেকে শুরু করে উৎপাদনশীল সকল খাতে খরচ হু হু করে বাড়বে।
বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো, যারা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল, তাদের জন্য পরিস্থিতি হবে সবচেয়ে ভয়াবহ। তেল আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হবে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান চরমভাবে ব্যাহত হবে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া মানে হলো বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনীটি কেটে ফেলা। ইরান এই রুটটিকে একটি ‘ভৌগোলিক অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করছে, যার প্রভাব কেবল যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের ওপর নয়, বরং সারা বিশ্বের প্রতিটি ঘরে পৌঁছাবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে এই অবরোধ তুলে দিতে ব্যর্থ হয়, তবে বিশ্ববাসী এক নজিরবিহীন জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকটের সাক্ষী হতে যাচ্ছে।