খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 25শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ৯ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যতে নতুন নেতৃত্বের আগমন নিয়ে বৈশ্বিক উত্তেজনার মাঝে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কঠোর বার্তা প্রদান করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের বিষয়টি সম্পূর্ণ দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং এতে কোনো বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। আজ সোমবার (৯ মার্চ) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এনবিসি-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই মন্তব্য করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ইরানের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ (Assembly of Experts) অত্যন্ত সক্রিয় রয়েছে এবং তারা নিয়ম অনুযায়ী দ্রুততম সময়ের মধ্যে নতুন নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে।
আব্বাস আরাকচি তার সাক্ষাৎকারে জোর দিয়ে বলেন যে, ইরানের শাসনব্যবস্থা একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্ব কেবল ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’-এর ওপর ন্যস্ত। এই বোর্ডটি মূলত দেশের জ্যেষ্ঠ ধর্মতাত্ত্বিক ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত, যারা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন। আরাকচি জানান, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই বোর্ড অত্যন্ত নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং শিগগিরই ইরানের কাণ্ডারি নির্ধারিত হবে।
তিনি আশ্বস্ত করেন যে, সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া চলাকালীন সময়েও দেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েনি। প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রিসভা এবং পার্লামেন্ট—সবাই তাদের নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। ইরানের শাসনতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে যে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন, তার কঠোর সমালোচনা করেন আব্বাস আরাকচি। ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেছিলেন যে, তাকে ছাড়া বা তার প্রভাব ছাড়া ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করা হলে তিনি তা মেনে নেবেন না এবং এর জন্য ইরানকে ‘কঠিন পরিণতি’ ভোগ করতে হবে।
এই হুমকির বিপরীতে আরাকচি বলেন, “নতুন নেতা নির্বাচন করা ইরানি জনগণের মৌলিক অধিকার। এটি কেবল আমাদের নিজেদের কাজ এবং এতে অন্য কোনো রাষ্ট্রের নাক গলানোর অধিকার নেই। ডোনাল্ড ট্রাম্প বা অন্য যেকোনো বাইরের শক্তির পক্ষ থেকে আসা যেকোনো চাপ বা হস্তক্ষেপের আমরা তীব্র প্রতিবাদ জানাই।” তিনি স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, ইরান তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আপসহীন এবং কোনো শর্তাধীন নেতৃত্বের কাছে মাথানত করবে না।
ইরানের শাসন কাঠামো ও নেতৃত্বের নির্বাচন প্রক্রিয়া একনজরে
| প্রশাসনিক অঙ্গ | নির্বাচনের মাধ্যম | মূল দায়িত্ব ও ক্ষমতা |
| সর্বোচ্চ নেতা (Supreme Leader) | অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস কর্তৃক মনোনীত | রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তিত্ব, সশস্ত্র বাহিনী ও বিচার বিভাগের প্রধান। |
| অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস | সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত (৮ বছর মেয়াদী) | সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন, পর্যবেক্ষণ এবং অপসারণ করার ক্ষমতা। |
| প্রেসিডেন্ট (President) | সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত | সরকারের নির্বাহী প্রধান, অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন। |
| পার্লামেন্ট (Majlis) | সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত | আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন ও মন্ত্রীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ। |
| গার্ডিয়ান কাউন্সিল | ৬ জন নেতা ও ৬ জন বিচারক দ্বারা গঠিত | নির্বাচনী প্রার্থীর যোগ্যতা যাচাই এবং আইনের সাংবিধানিকতা পরীক্ষা। |
আরাকচির এই বক্তব্যটি এমন এক সময়ে এল যখন মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরান এক ক্রান্তিকাল পার করছে। নতুন সর্বোচ্চ নেতা কে হবেন, তার ওপর ভিত্তি করে আগামী কয়েক দশকের বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং পরমাণু চুক্তির গতিপথ নির্ধারিত হতে পারে। পশ্চিমা শক্তিগুলো চাইছে ইরানে এমন এক নেতৃত্ব আসুক যারা আপসকামিতায় বিশ্বাসী, অন্যদিকে ইরান চাইছে তাদের নিজস্ব ইসলামি মূল্যবোধ ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে সক্ষম—এমন কোনো ব্যক্তিত্বকে স্থলাভিষিক্ত করতে।
আরাকচি তার সাক্ষাৎকারে পুনরায় মনে করিয়ে দেন যে, ইরান তার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন রক্ষায় বদ্ধপরিকর। তার এই অনমনীয় অবস্থান মূলত ওয়াশিংটনের ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা ক্ষমতা পরিবর্তনের কৌশলের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক প্রতিরোধ। তিনি বিশ্বাস করেন, ইরানি জনগণ তাদের নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণে সক্ষম এবং বাইরের কোনো শক্তির চোখ রাঙানি তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারবে না।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই দৃঢ় অবস্থানের ফলে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার কূটনৈতিক দূরত্ব আরও বৃদ্ধি পাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে অভ্যন্তরীণভাবে এটি ইরানি নাগরিকদের মধ্যে জাতীয়তাবোধ ও সার্বভৌমত্বের চেতনাকে আরও শানিত করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ শেষ পর্যন্ত কার হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে সারা বিশ্ব।