চলতি বছরের এপ্রিল মাসের শুরুতেই দেশে প্রবাসী আয়ের প্রবাহে উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন দেখা গেছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য এক ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মাসের প্রথম চার দিনেই রেমিট্যান্স প্রবাহে যে শক্তিশালী গতি লক্ষ্য করা গেছে, তা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার পাশাপাশি আমদানি ব্যয় মেটানো ও লেনদেন ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের প্রথম চার দিনে দেশে মোট ৩৩ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে) এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪ হাজার ১৩৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা। ফলে দৈনিক গড়ে এক হাজার কোটিরও বেশি টাকা দেশে প্রবেশ করছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম উচ্চ প্রবাহ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
রোববার (৫ এপ্রিল) বিকেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, প্রবাসীদের মধ্যে বৈধ পথে অর্থ প্রেরণের প্রবণতা বাড়ছে এবং সরকার প্রদত্ত প্রণোদনা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে পুরো এপ্রিল মাসেই রেমিট্যান্স প্রবাহ উচ্চমাত্রায় থাকতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
গত বছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে প্রবৃদ্ধির হার অত্যন্ত চমকপ্রদ। ২০২৫ সালের এপ্রিলের প্রথম চার দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল মাত্র ৬ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। সেই হিসেবে চলতি বছরে একই সময়ে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৪২৫ দশমিক ৩০ শতাংশ, যা একে সাম্প্রতিক সময়ের ব্যতিক্রমধর্মী উল্লম্ফন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তুলনামূলক চিত্র (এপ্রিলের প্রথম ৪ দিন)
| সময়কাল |
রেমিট্যান্স (মার্কিন ডলার) |
বাংলাদেশি মুদ্রায় (কোটি টাকা) |
প্রবৃদ্ধি |
| ২০২৬ |
৩৩.৯০ কোটি |
৪,১৩৫.৮০ |
— |
| ২০২৫ |
৬.৫০ কোটি |
৭৯৩.০০ |
৪২৫.৩০% |
শুধু মাসিক নয়, চলতি অর্থবছর জুড়েও রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ৬৫৪ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ২ হাজার ১৮৫ কোটি ডলার। ফলে বার্ষিক ভিত্তিতে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ২১ দশমিক ৫০ শতাংশ, যা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রবাসী আয়ের এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি আমদানি ব্যয় নির্বাহ, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও এটি কার্যকর ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রভাব সুস্পষ্ট—এটি পরিবারভিত্তিক ভোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগে ব্যবহৃত হয়ে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার ঘোষিত প্রণোদনা, হুন্ডি কার্যক্রম দমনে নজরদারি জোরদার এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার সম্প্রসারণ রেমিট্যান্স বৃদ্ধির পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওঠানামা ভবিষ্যতে এই প্রবাহের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, এপ্রিলের শুরুতেই রেমিট্যান্সে এই শক্তিশালী উত্থান দেশের অর্থনীতির জন্য এক স্বস্তিদায়ক সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা সামনের দিনগুলোতে আরও ইতিবাচক প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।