খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
কুমিল্লায় জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আনিসুজ্জামানের সঙ্গে স্থানীয় এক ছাত্রদল নেতার প্রকাশ্য তর্কাতর্কির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনার একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা ও তোলপাড় শুরু হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে জুলাই শহীদ দিবস স্মরণে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসক রোজী আক্তারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় জেলার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক শীর্ষ ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
ঘটনার বিবরণী থেকে জানা যায়, সভার একপর্যায়ে জুলাই আন্দোলনে ঢাকায় নিহত কুমিল্লার লাকসামের বাসিন্দা জিসানের বাবা তাঁর নিজের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিযোগ করেন, স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতা-কর্মীরা তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে নানাভাবে এলাকা ছাড়ার হুমকি দিচ্ছেন।
জিসানের বাবার এই বক্তব্যের সূত্র ধরে উপস্থিত কুমিল্লা মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফখরুল ইসলাম সরাসরি পুলিশ সুপারের দিকে আঙুল তোলেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, “আপনি কুমিল্লায় এসপি হিসেবে আসার পর থেকে এলাকায় ফ্যাসিস্টরা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আপনি তাদের গ্রেপ্তার করছেন না। আমরা অপরাধীদের সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়ার পরও পুলিশ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। জিসানের বাবাকে হুমকি দেওয়ার ঘটনায় জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে।”
ছাত্রদল নেতার এমন ঢালাও ও আক্রমণাত্মক বক্তব্যের জবাবে কুমিল্লার এসপি মো. আনিসুজ্জামান নিজের ক্ষোভ ধরে রাখতে পারেননি। তর্কের একপর্যায়ে তিনি ফখরুল ইসলামকে উদ্দেশ করে বেশ কড়া ভাষায় বলেন, “এটা কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ নয়। আপনার বহু আগে আমি ঢাকায় ছাত্রদল করেছি। যাকে আপনার পছন্দ হয় না, তাকেই আপনারা ফ্যাসিস্ট বানিয়ে দেন। মামলায় কাকে গ্রেপ্তার করা হবে বা হবে না, তা সম্পূর্ণ আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।”
এসপি আরও উল্লেখ করেন, জিসান যেহেতু ঢাকায় নিহত হয়েছেন, তাই সেই সংক্রান্ত মামলাটি ঢাকায় দায়ের হয়েছে। স্থানীয় পুলিশ সব সময় আইন অনুযায়ী কাজ করে। রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার পরিবর্তে তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে কথা বলা উচিত এবং সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া প্রশাসনের ওপর এভাবে ঢালাও অভিযোগ করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়।
আলোচনা সভায় কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান উদবাতুল বারী, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মাহমুদ ওয়াসিমসহ আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মী ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। সবার সামনে এমন বাকবিতণ্ডার ভিডিওটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
এ বিষয়ে পরবর্তীতে জানতে চাওয়া হলে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান দাবি করেন, তাঁর বক্তব্যের কেবল একটি খণ্ডিত অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রচার করা হচ্ছে। গত বছরের ৩০ নভেম্বর কুমিল্লার এসপি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া এই কর্মকর্তা নিজেকে ছাত্রদলের সাবেক কর্মী হিসেবে উল্লেখ করার বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, অতীতে ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং উদাহরণ হিসেবেই বিষয়টি সভায় তুলে ধরেছেন। তবে সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর থেকে তিনি সম্পূর্ণ পেশাদারত্বের সঙ্গেই নিজের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
এসপি আনিসুজ্জামান পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, ওই ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে হওয়া বিভিন্ন মামলা নিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। তিনি কুমিল্লায় যোগদানের পর থেকে এই ধরনের মামলা-বাণিজ্য ও অবৈধ সুযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছেন। আর সেই ক্ষোভ থেকেই ওই নেতা পুলিশের বিরুদ্ধে এমন ঢালাও ও ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলছেন।
অবশ্য পুলিশ সুপারের এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন ছাত্রদল নেতা ফখরুল ইসলাম। তিনি জানান, তাঁর বিরুদ্ধে আনা মামলা-বাণিজ্যের অভিযোগটি সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। এমন কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ যদি পুলিশের কাছে থাকত, তবে অনেক আগেই তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতো। কেবল নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতেই পুলিশ প্রশাসন এখন উল্টো তাঁর ওপর দায় চাপাচ্ছে।