মনজুর রশীদ বিদ্যুৎ
প্রকাশ: বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২৬
ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র আর তার পরম মিত্র ইজরাইলের মধ্যেকার বর্বোরোচিত যুদ্ধের যে মুহূর্তে বিশ্ব দানব ডোনাল্ড ট্রাম্প এর বেঁধে দেয়া সময়সীমার মধ্যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না করলে একদিনের মধ্যে ইরানের অবকাঠামোকে গুড়িয়ে দিয়ে পারস্য সভ্যতাকে ধ্বংস করার ঘোষণার টানটান উত্তেজনার মধ্যে যখন বিশ্বের প্রায় ৮.২ বিলিয়ন মানুষের চোখেমুখে তুমুল উত্তেজনা—ঠিক সেই মুহূর্তে একটা চরম হতাশাজনক ঘটনা ঘটে গেলো বাংলাদেশের ক্রিকেট অঙ্গনে।
এটা অত্যন্ত দুঃখজনক একটা ঘটনা এ জন্য যে, আমিনুল ইসলাম বুলবুল এর মত বাংলাদেশের ক্রিকেটকে লাইমলাইটে নিয়ে আসা একজন অভিজ্ঞ ক্রিকেট অধিপতিকে বিদেশ থেকে আমন্ত্রণ জানিয়ে দেশে নিয়ে এসে বোর্ড প্রধান বানিয়ে তাকে যেভাবে অপমানিত করে বিদায় করে দেয়া হলো তা কোন সভ্য দেশের ঘটনা হতে পারেনা। তিনি নিজে এসে এই দায়িত্ব গ্রহণ করেননি, বরং তাকে বারংবার অনুরোধ করে অষ্ট্রেলিয়া থেকে দেশে আনা হয়েছিল। যদি তাকে সরিয়ে দেয়াটা অত্যাবশকীয়ই হয়ে উঠবে, তবে তা কেন এমন অসম্মানজনক পদাংক অনুসরণ করে করা হবে? বিষয়টা কি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সুন্দরভাবে সূরাহা করা যেতোনা?
এ যেন অনেকটা বাংলাদেশের ব্যাংক এর সাম্প্রতিককালে সরিয়ে দেয়া গভর্নর প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর এর পুনরাবৃত্তি ঘটলো। যিনি বিগত ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর দেশের আর্থিক খাতে সংস্কার ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন। পত্রিকান্তরে জানা যায়, তার জায়গায় বিশেষ যাচাই-বাছাই ছাড়াই হঠাৎ করে গভর্নর পদে নিয়োগ দেয়া হয় সোয়েটার ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকুর রহমানকে। একেবারেই অপরিচিত নতুন এই গভর্নরের বিরুদ্ধে ঋণ খেলাপি ও স্বার্থের সংঘাতের (Conflict of interest) অভিযোগ তুলে টিআইবি এবং বিরোধী দলগুলো এই নিয়োগের নিরপেক্ষতা নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছে।
তবে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির জনপ্রিয়তা তুঙ্গে থাকায় তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও পরাজিত হন বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক গোলরক্ষক আমিনুল ইসলাম ঢাকা-১৬ আসনে। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আস্থাভাজন পরাজিত প্রার্থী এই খেলোয়াড়কে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়ার শুরু থেকেই তার আচরণ ও কার্যকলাপে দাম্ভিকতার পরিচয় ফুটে উঠছে বলে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকেই অভিযোগ করছেন। গতকাল ৭ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (NSC) আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন বিসিবি পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে পুনঃজীবন নিয়ে ফিরে আসা বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালকে প্রধান করে ১১ সদস্যের একটি অ্যাডহক কমিটি গঠন করেছে। এই ১১ জনের মধ্যে যারা রয়েছেন তাদের মধ্যে কি কারণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সন্তান, বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসের ছেলে, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদের ছেলে, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের স্ত্রী, কিংবা বিএনপির সাবেক মন্ত্রী ও নেতা মিজানুর রহমান সিনহার ভাতিজার অন্তর্ভূক্তি অপরিহার্য—তা আমার মত অনেকের কাছেই স্পষ্ট নয়। এক্ষেত্রে কি দেশের ক্রীড়াঙ্গনের প্রতিষ্ঠিত সাবেক ক্রিকেট খেলোয়াড়, কোচ, সংগঠক এমনকি ক্রিকেটপ্রেমী এমপিদের সম্পৃক্ত করলে সরকারের ভাবমূর্তি কি আরও উজ্জ্বল হতো না? অনেকেই সোস্যাল মিডিয়ায় অভিযোগ করে বলছেন— তামিম ইকবালই বিএনপির এসব বড় বড় নেতা-মন্ত্রীদের সন্তানদের অন্তর্ভুক্তিতে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছেন।
দেশের একজন ক্রিকেটপ্রেমী দর্শক হিসেবে বলতে চাই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কার ক্রিকেট বোর্ড গঠন নিয়েও বিতর্ক রয়ে গেছে। তাই নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়ার নেতৃত্বাধীন এ সরকারের কাছে প্রত্যাশা ক্রিকেটের সাথে সংশ্লিষ্ট দেশের সত্যিকারের কিছু অভিজ্ঞ, বিতর্কহীন, সৎ ও যোগ্যদেরকে কিছুদিন দায়িত্ব দিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনের মাধ্যমে কয়েক মাসের মধ্যে একটা কার্যকরী ক্রিকেট বোর্ড গঠন করা। আর বুলবুল সহ মাশরাফি, সাকিবের মত দেশের ক্রিকেটের প্রিয় মুখ যারা বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে উজ্জ্বলভাবে প্রতিনিধিত্ব করেছেন, তাদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা। বিগত আওয়ামী শাসনামলের সরকারের সময় আমরা যে অন্যায়গুলো বিভিন্ন সেক্টরের পাশাপাশি দেশের ক্রীড়াঙ্গনে ঘটতে দেখেছি, তা আবার ফিরে আসুক এটা কারোই কাম্য নয়।
এ সরকার ক্ষমতায় আসীন পর থেকে সরকার প্রধান হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের সাদাসিধে জীবন, মানুষের প্রতি বিনয়ী আচরণ ও তার প্রচন্ড কর্ম স্পৃহা দেশের মানুষের মনে যথেষ্ট আস্থার জায়গা তৈরি করেছে। কিন্তু তাকেও কখনো কখনো নিরপেক্ষ দৃষ্টি দিয়ে তার টিমের লোকজনদের কার্যকলাপ পরখ করে দেখতে হবে। অন্যদের বিভিন্ন নেতিবাচক কার্যকলাপের কারণে তার দলের কোন কাজগুলো জনগণের মতের বিপক্ষে যাচ্ছে, সেটাও তাকে অনুধাবন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। তার দলের কোনো মন্ত্রী, এমপি, নেতা বা কর্মী যা-ই করুক, মানুষ মনে করবে এগুলো তার দল বিএনপি’র কাজ এবং দিনশেষে সকল দায়ভার এসে পড়বে তার একার ওপর!
বিশ্বের বুকে ক্রীড়াঙ্গনে আমাদের আনন্দ, সাফল্য ও স্বপ্নের একমাত্র খেলা ক্রিকেট। বাংলার রয়্যাল বেঙ্গল টাইগাররা একসময় শুধু এশিয়া কাপ নয়, বিশ্বকাপও নিয়মিতভাবে ছিনিয়ে আনবে—দল, মত নির্বিশেষে সবাই এটাই প্রত্যাশা করে। তাই আমাদের ক্রিকেট রাজনীতির উর্ধ্বে থাকুক এবং সত্যিকারের ক্রিকেট পাগল মানুষদের দ্বারা পরিচালিত হোক – মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট এটাই আমাদের চাওয়া।
সমাজ বিশ্লেষক, গবেষক ও ক্রীড়া বিষয়ক লেখক।