খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 6শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ১৯ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
লিবিয়ার পশ্চিম উপকূলে উন্নত জীবনের সন্ধানে ইউরোপ অভিমুখী যাত্রায় ফের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। দেশটির রাজধানী ত্রিপোলি থেকে প্রায় ১১৭ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত জুয়ারা উপকূল থেকে গত কয়েক দিনে মোট ১৭ জন অভিবাসীর মরদেহ উদ্ধার করেছে স্থানীয় উদ্ধারকারী কর্তৃপক্ষ। লিবিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ইমার্জেন্সি মেডিসিন অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টার এই উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে।
উদ্ধারকারী দলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ১৬ জনের পরিচয় ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রাথমিক নিশ্চিতকরণ সম্ভব হয়েছে। উদ্ধারকৃত ১৭ জনের মধ্যে ১৪ জনের মরদেহ ইতোমধ্যে যথাযথ ধর্মীয় ও আইনি বিধি অনুসরণ করে দাফন করা হয়েছে। বাকিদের মধ্যে একজনের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে, যিনি বাংলাদেশি নাগরিক। ত্রিপোলিতে অবস্থানরত তার পরিবারের কাছে ইতোমধ্যেই মরদেহটি হস্তান্তর করেছে স্থানীয় প্রশাসন। অন্য দুজনের পরিচয় উদ্ঘাটনে এখনো তদন্ত ও ডিএনএ বিশ্লেষণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
উদ্ধারকারী সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত চিত্রগুলোতে দেখা যায়, স্বাস্থ্যকর্মী ও জরুরি বিভাগের সদস্যরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মরদেহগুলো সংগ্রহ করে অ্যাম্বুলেন্সে স্থানান্তর করছেন। এই অভিবাসীরা মূলত উত্তাল ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০১১ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়ায় সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে মানব পাচারকারী চক্রগুলো দেশটিকে ইউরোপে প্রবেশের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করছে। মূলত এশিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা হাজার হাজার মানুষ দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং যুদ্ধবিগ্রহ থেকে বাঁচতে এই বিপজ্জনক পথ বেছে নিচ্ছেন।
নিচে লিবিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় রুটে অভিবাসীদের বর্তমান পরিস্থিতির একটি সংক্ষিপ্ত সারণি দেওয়া হলো:
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| প্রধান রুট | কেন্দ্রীয় ভূমধ্যসাগরীয় রুট (লিবিয়া থেকে ইতালি/মাল্টা) |
| ঝুঁকির ধরন | ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আরোহী, ত্রুটিপূর্ণ প্লাস্টিক বা রাবারের নৌকা, প্রতিকূল আবহাওয়া |
| অন্যান্য বিপদ | সাহারা মরুভূমিতে পানিশূন্যতা ও মানব পাচারকারীদের হাতে বন্দিত্ব |
| প্রধান গন্তব্য | ইতালি, গ্রিস এবং মাল্টা |
| আন্তর্জাতিক সংস্থা | আইওএম (IOM) এবং ইউএনএইচসিআর (UNHCR) |
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM)-এর তথ্যমতে, ভূমধ্যসাগরের এই রুটটি বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী অভিবাসন পথ হিসেবে স্বীকৃত। পাচারকারীরা অভিবাসীদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে জরাজীর্ণ ও ছোট নৌকায় করে সাগরে ভাসিয়ে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে লাইফ জ্যাকেট বা পর্যাপ্ত জ্বালানি ছাড়াই তাদের গন্তব্যের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। পথিমধ্যে নৌকার ইঞ্জিন বিকল হওয়া বা উত্তাল তরঙ্গে নৌকা ডুবে যাওয়ার ফলে নিয়মিত বিরতিতে এমন প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়।
লিবিয়ার জুয়ারা এবং সাবরাথা এলাকাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই মানব পাচারকারীদের স্বর্গরাজ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। উপকূলীয় রক্ষীবাহিনীর কঠোর নজরদারি সত্ত্বেও রাতের আঁধারে শত শত মানুষ নৌকায় চড়ে অজানার উদ্দেশ্যে রওনা হন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের অনেক তরুণও উন্নত আয়ের আশায় এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে লিবিয়া হয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করছেন, যা প্রায়শই মর্মান্তিক পরিণতির মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও ইমার্জেন্সি মেডিসিন অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টার জানিয়েছে, তারা উপকূলীয় এলাকায় তল্লাশি অব্যাহত রেখেছে এবং অজ্ঞাত পরিচয় অভিবাসীদের শনাক্ত করার জন্য দূতাবাসগুলোর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছে। লিবিয়ায় অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের দূতাবাসগুলোকেও তাদের নাগরিকদের এমন ঝুঁকিপূর্ণ পথ পরিহার করার জন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়েছে।