জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে হত্যাচেষ্টার মামলায় দেড় মাস বয়সী কন্যাসন্তানকে সঙ্গে নিয়েই কারাগারে পাঠানো হয় যুব মহিলা লীগের কর্মী শিল্পী বেগমকে। তবে একই দিন রাতেই আদালতের পুনর্বিবেচনায় তিনি জামিনে মুক্তির আদেশ পান। ঘটনাটি মঙ্গলবার ঢাকার আদালতপাড়ায় ঘটে, যা ঘিরে দিনভর ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়।
গ্রেপ্তার ও আদালতে হাজির
গত সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার তেজকুনিপাড়া রেলওয়ে কলোনি থেকে শিল্পী বেগমকে গ্রেপ্তার করে তেজগাঁও থানা পুলিশ। পরদিন মঙ্গলবার বিকেলে তাঁকে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শেখ নজরুল ইসলাম তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আবেদন করেন।
আবেদনে দাবি করা হয়, জুলাই আন্দোলন চলাকালে সংঘটিত সহিংসতায় তাঁর সক্রিয় ভূমিকার প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং তদন্ত চলমান থাকায় তাঁকে কারাগারে রাখা প্রয়োজন।
আদালতে মানবিক আবেদন
বেলা প্রায় ২টার দিকে শিল্পী বেগমকে এজলাসে তোলা হয়। এ সময় তাঁর স্বামী, সন্তান, বোন ও অন্যান্য স্বজন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখী জামিনের আবেদন জানিয়ে বলেন, আসামির দেড় মাস বয়সী শিশুসন্তান রয়েছে এবং তিনি সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের রোগী। শারীরিকভাবে অসুস্থ অবস্থায় তাঁর পক্ষে সন্তান লালন-পালন করা কঠিন।
তবে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মোহাম্মদ জুনায়েদ জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আদালতে আবেগঘন পরিস্থিতি
জামিন না মঞ্জুরের আদেশ শুনে শিল্পী বেগম কান্নায় ভেঙে পড়েন। উপস্থিত স্বজনরা তাঁর দেড় মাসের শিশুকে কোলে নিয়ে আদালতপাড়ায় অবস্থান করেন। সন্তানকে দুধ পান করানোর দৃশ্য আদালত এলাকায় আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি করে।
শিল্পী বেগম বলেন, সিজার অপারেশনের কারণে তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল এবং শিশুকে ঠিকভাবে দেখভাল করতে পারছেন না। তিনি সন্তানকে নিজের সঙ্গে না রাখার অনুরোধ জানান।
বিকেল ৩টা ১২ মিনিটে তাঁকে হাজতখানায় নেওয়া হয়। এ সময় শিশুসন্তানসহ মাকে কাশিমপুর কারাগারে পাঠানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়।
পুনর্বিবেচনায় রাতেই জামিন
ঘটনাটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এরপর তাঁর আইনজীবী পুনরায় জামিনের আবেদন করেন। রাত ৮টার দিকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে তাঁকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন।
শর্ত অনুযায়ী, তাঁকে ৫ হাজার টাকার মুচলেকা দিতে বলা হয় এবং মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল পর্যন্ত তিনি জামিনে থাকবেন।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ
| বিষয় |
তথ্য |
| মামলার সময় |
জুলাই আন্দোলন (২০২৪) |
| অভিযোগ |
শিক্ষার্থীকে হত্যাচেষ্টা ও হামলা |
| ঘটনার স্থান |
চানখাঁরপুল ও তেজগাঁও এলাকা |
| মামলার বাদী |
ভুক্তভোগীর মা শাহনুর খানম |
| আসামি সংখ্যা |
১০৩ জন নামীয় ও ১২০–১৩০ জন অজ্ঞাত |
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চানখাঁরপুল এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাহমিদ মুবিন রাতুল গুলিবিদ্ধ হন। পরে ২৩ জুলাই তাঁর তেজগাঁওয়ের বাসায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করা হয়। এ ঘটনায় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তেজগাঁও থানায় মামলা দায়ের করা হয়।
আইনগত ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
ঘটনাটি ঘিরে আইনজীবী মহল, মানবাধিকারকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকেই আদালতের প্রথম সিদ্ধান্তকে কঠোর বলে উল্লেখ করলেও পরে জামিন দেওয়ার সিদ্ধান্তকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে দেখছেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুসন্তানসহ নারী আসামিদের ক্ষেত্রে বিচারিক সিদ্ধান্তে মানবিক দিক বিবেচনা করা আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ডের অংশ।
উপসংহার
একই দিনে আদালতের দুই ভিন্ন সিদ্ধান্তে দেড় মাসের শিশুসন্তানসহ এক নারী আসামির কারাগারে যাওয়া এবং পরে জামিন পাওয়া বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় মানবিক ও আইনি বিবেচনার ভারসাম্য নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।