সীমান্তে কড়া নজরদারি, মোতায়েন ৬০ হাজার বিজিবি সদস্য
খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে অবৈধ ‘পুশ ইন’ ঠেকাতে দেশের ২৬টি সীমান্তবর্তী জেলায় প্রায় ৬০ হাজার সদস্য মোতায়েন করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪ হাজার ৪৮৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। চার পালায় ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছেন সদস্যরা। সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় জনগণও নজরদারি কার্যক্রমে সহযোগিতা করছেন।
বিজিবি জানিয়েছে, গত বুধবার থেকে শনিবার পর্যন্ত চার দিনে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক পরিচালিত ২১টি পৃথক পুশ ইন প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় দুই শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
চার দিনে প্রতিহত হওয়া পুশ ইন প্রচেষ্টা
বিজিবির তথ্যমতে, সর্বশেষ শনিবার মেহেরপুরের তেঁতুলবাড়িয়া, ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও এবং দিনাজপুরের বিরামপুর সীমান্ত দিয়ে যথাক্রমে ৭ জন, ১১ জন ও ৫ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়। তবে বিজিবি ও স্থানীয়দের কঠোর অবস্থানের কারণে এসব প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
এর আগে ৩ জুন থেকে বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় আরও ১৮টি পৃথক ঘটনায় ১৮৬ জনকে পুশ ইন করার চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয় বিজিবি।
বিষয়
তথ্য
মোতায়েন বিজিবি সদস্য
৬০ হাজার
সীমান্ত জেলার সংখ্যা
২৬
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের দৈর্ঘ্য
৪,৪৮৭ কিলোমিটার
চার দিনে প্রতিহত পুশ ইন
২১টি ঘটনা
পুশ ইনের চেষ্টাকৃত ব্যক্তি
২০০ জনের বেশি
৩ জুন থেকে প্রতিহত ব্যক্তি
১৮৬ জন
২৬ জেলার সীমান্তে জোরদার নিরাপত্তা
বিজিবি সদর দপ্তর জানিয়েছে, সম্ভাব্য পুশ ইন ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্টগুলো চিহ্নিত করে সেখানে অতিরিক্ত টহল ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, যশোর, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, ফেনী, মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, খাগড়াছড়ি, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, কুমিল্লা, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নীলফামারী, পঞ্চগড়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও শেরপুর।
বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউনিফর্মধারী সদস্যদের পাশাপাশি সাদাপোশাকে সদস্যদেরও গোয়েন্দা নজরদারিতে নিয়োজিত করা হয়েছে।
দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে নজরদারি
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের সবচেয়ে বড় অংশ পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সঙ্গে, যার দৈর্ঘ্য ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটার। অবশিষ্ট অংশ ত্রিপুরা, মেঘালয়, মিজোরাম ও আসাম রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত। সীমান্তের কিছু এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো উন্মুক্ত রয়েছে।
বিজিবি ও সীমান্ত সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন এলাকায় নারী, পুরুষ ও শিশুদের জড়ো করে পুশ ইনের চেষ্টা করা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যর্থ হওয়ার পর তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হলেও অনেককে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না বলে জানা গেছে।
পুশ ইন বিষয়ে বিজিবির অবস্থান
বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম বলেছেন, আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বিদ্যমান আইন এবং বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পরিপন্থী কোনো ধরনের পুশ ইন গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, সীমান্ত দিয়ে কাউকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না এবং ৩ জুনের পর কোনো পুশ ইন সফল হয়নি।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে মোট ২ হাজার ৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইন করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১২০ জন ছিলেন ভারতীয় নাগরিক। তবে ওই সময়ের পর আর কোনো পুশ ইন ঘটেনি বলে বিজিবির দাবি।
দিল্লির সম্মেলনে গুরুত্ব পাবে সীমান্ত ইস্যু
৮ থেকে ১১ জুন ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিজিবি জানিয়েছে, সম্মেলনে অবৈধ পুশ ইন, সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা, অবৈধ অনুপ্রবেশ, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, মানব পাচার, সীমান্ত আইন লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে অননুমোদিত অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
বিজিবির উপমহাপরিচালক (গণমাধ্যম) কর্নেল আবুল হাসনাত মাহমুদ আজম বলেন, জোরপূর্বক ভারতীয় নাগরিক ও বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের বাংলাদেশে পুশ ইন বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা, আহত ও নির্যাতনের ঘটনা বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হবে।
সীমান্ত হত্যার অভিযোগ
সীমান্তে পুশ ইনের পাশাপাশি বিএসএফের বিরুদ্ধে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যার অভিযোগও রয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সীমান্তে ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৪ জন গুলিতে এবং ১০ জন নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যান। এর আগে ২০২৪ সালে ৩০ জন এবং ২০২৩ সালে ৩১ জন বাংলাদেশি সীমান্তে নিহত হন।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সম্প্রতি সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ কোনো ধরনের অবৈধ পুশ ইন বা পুশ ব্যাকের পক্ষে নয়। এ কারণে সীমান্তে বিজিবিকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সীমান্ত নিরাপত্তা ও নজরদারি জোরদার রেখে যেকোনো অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে বিজিবি কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।