খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 10শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ২৩ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
দেশের একমাত্র বিশেষায়িত পাবনা মানসিক হাসপাতালে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও রোগীর গোপনীয়তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতালের ভেতরে ‘রোগী দেখার’ অজুহাতে সাধারণ মানুষ অবাধে প্রবেশ করছে। একই সঙ্গে কিছু কথিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর রোগীদের ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করছে, যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ও নৈতিক প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিছু ব্যক্তি ও কনটেন্ট নির্মাতা পরিচয়ধারী গোষ্ঠী হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করে মানসিক রোগীদের উদ্দেশ্য করে ভিডিও ধারণ করছে। এসব ভিডিওতে রোগীদের অস্বাভাবিক আচরণকে কেন্দ্র করে ব্যঙ্গাত্মক ও অপমানজনক কনটেন্ট তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে এসব ভিডিও বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা রোগীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের গুরুতর উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অনুসন্ধানকালে আরও উঠে এসেছে যে, হাসপাতালের প্রবেশপথে দায়িত্বে থাকা কিছু আনসার সদস্যকে অর্থের বিনিময়ে অননুমোদিতভাবে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, জনপ্রতি প্রায় ৫০ টাকা ঘুষ নিয়ে ভেতরে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়। এই অনিয়মের মাধ্যমে একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, যারা পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ ধরনের অনুপ্রবেশ রোগীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। মানসিক রোগীদের অনেকেই সংবেদনশীল অবস্থায় থাকেন, যাদের অতীত ট্রমা বা মানসিক আঘাত পুনরায় উসকে দেওয়ার মতো আচরণ তাদের চিকিৎসা প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
| বিষয় | অবস্থা |
|---|---|
| অনুপ্রবেশের ধরন | রোগী দেখার নামে সাধারণ মানুষের প্রবেশ |
| ভিডিও কার্যক্রম | রোগীদের নিয়ে কনটেন্ট তৈরি ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচার |
| নিরাপত্তা লঙ্ঘন | ঘুষের মাধ্যমে প্রবেশের অভিযোগ |
| ঘুষের পরিমাণ | জনপ্রতি আনুমানিক ৫০ টাকা |
| সংশ্লিষ্ট পক্ষ | কিছু আনসার সদস্য ও অননুমোদিত দর্শনার্থী |
| প্রশাসনিক ব্যবস্থা | কিছু সদস্য অব্যাহতি প্রদান |
হাসপাতালের মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এ কে এম শফিউল আজম বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড রোগীদের মানসিক অবস্থার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। তার মতে, রোগীদের ব্যক্তিগত জীবনের দুর্বল মুহূর্তগুলোকে ভিডিও আকারে প্রকাশ করা তাদের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। তিনি বলেন, “টিকটকার বা কনটেন্ট নির্মাতারা রোগীদের সামনে গিয়ে তাদের অতীতের দুঃখ-কষ্ট স্মরণ করিয়ে দেয়, যা মানসিকভাবে অত্যন্ত ক্ষতিকর।”
অন্যদিকে হাসপাতালের পরিচালক শাফকাত ওয়াহিদ জানিয়েছেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, হাসপাতালের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়েছে এবং অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগে দুইজন আনসার সদস্যকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনুপ্রবেশ রোধে নজরদারি বাড়ানো হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের অনিয়ম চললেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ছিল না। ফলে একটি স্বার্থান্বেষী চক্র সুযোগ নিয়ে রোগীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোগীর গোপনীয়তা, সম্মান ও নিরাপত্তা। কিন্তু এ ধরনের ভিডিও কনটেন্ট ও অননুমোদিত প্রবেশ সেই মৌলিক নীতিকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে। স্থানীয়রা দ্রুত হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো, অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।