প্রখর গ্রীষ্মের দাবদাহে কক্সবাজার জেলার জনজীবন বিপর্যস্ত হলেও সাধারণত এ সময়টি শুঁটকি উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে উপযোগী মৌসুম হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু চলতি বছর সেই অনুকূল আবহাওয়া কাজে লাগাতে পারছেন না শুঁটকি ব্যবসায়ীরা। মূলত সাগরে মাছ শিকারে ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা এবং দীর্ঘদিন ধরে মাছের সংকটের কারণে জেলার শুঁটকিপল্লির অধিকাংশ মহাল বন্ধ হয়ে গেছে।
কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের নাজিরারটেক উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৭০০টি শুঁটকিমহাল রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৬৫০টি মহালে বর্তমানে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ার আগে অন্যান্য বছর ব্যবসায়ীরা মাছ সংগ্রহ করে রাখলেও এ বছর তা সম্ভব হয়নি। ফলে কাঁচামালের অভাবে উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়েছে। কেবল বিদেশ থেকে আমদানি করা কিছু মাছ ব্যবহার করে প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি মহালে সীমিত আকারে শুঁটকি উৎপাদন চলছে।
এ পরিস্থিতির কারণে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী। নাজিরারটেক শুঁটকিপল্লির অধিকাংশ শ্রমিকই জলবায়ুজনিত কারণে বাস্তুচ্যুত হয়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছেন এবং জীবিকার জন্য এই পেশার ওপর নির্ভরশীল।
শ্রমিকদের মধ্যে অনেকে দৈনিক ১২ ঘণ্টা কাজ করে প্রায় ৫০০ টাকা মজুরি পান, যা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি অসুস্থ থাকায় নারীদেরই দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। এতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে জানা গেছে।
কক্সবাজার শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির তথ্যমতে, গত কয়েক মাসে সাগরে মাছ ধরা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর ফলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীলতা কমে গিয়ে আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম হয়ে ভারত ও ওমান থেকে আমদানি করা মাছ দিয়ে সীমিত উৎপাদন চলছে।
জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে জেলায় শুঁটকির উৎপাদন হয়েছে ৩১ হাজার মেট্রিক টনের বেশি। যেখানে আগের অর্থবছরে মোট উৎপাদন ছিল ৪৮ হাজার ২৮৫ মেট্রিক টন।
নিচে উৎপাদনের তুলনামূলক চিত্র দেওয়া হলো—
| সময়কাল |
মোট উৎপাদন (মেট্রিক টন) |
মাসিক গড় উৎপাদন |
| আগের অর্থবছর (১২ মাস) |
৪৮,২৮৫ |
প্রায় ৪,০০০ |
| চলতি অর্থবছর (৮ মাস) |
৩১,০০০+ |
প্রায় ৩,৮০০ |
এদিকে কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন বাজারে শুঁটকির দামে ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গেছে। স্থানীয় উৎপাদন বন্ধ থাকায় দোকানগুলোতে আমদানিকৃত শুঁটকি বিক্রি হচ্ছে, যার অনেকটাই দীর্ঘদিন হিমাগারে সংরক্ষিত ছিল। ফলে বাজারে প্রতি কেজি শুঁটকির দাম ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞা শেষে জেলেরা সাগরে মাছ ধরতে নামলে কাঁচামালের সরবরাহ বাড়বে এবং শুঁটকি উৎপাদন পুনরায় স্বাভাবিক হতে পারে। তখন বাজারে দামও কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।