খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় গত ৪৮ ঘণ্টায় কালবৈশাখী ঝড় ও বজ্রপাতের তাণ্ডবে মোট ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আজ সোমবার (২৭ এপ্রিল, ২০২৬) বিকেল পর্যন্ত সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, নোয়াখালী ও হবিগঞ্জ জেলায় বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৮ জন। এর আগে গতকাল রবিবার (২৬ এপ্রিল) দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝড় ও বজ্রপাতের ঘটনায় আরও ১৪ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। দুই দিনের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশের উত্তরাঞ্চল ও হাওরবেষ্টিত জেলাগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
সুনামগঞ্জ জেলায় ধান কাটার মৌসুমে বজ্রপাত এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ সোমবার বিকেলে পৃথক তিনটি স্থানে বজ্রপাতের ঘটনায় তিন কৃষকের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও অন্তত তিনজন।
সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের বৈঠাখালী গ্রামের বাসিন্দা জমির হোসেন (৪২) এবং মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের আব্দুল্লাহপুর গ্রামের জমির উদ্দিন (৪৬) নিজেদের হাওরে বোরো ধান কাটার সময় আকস্মিক বজ্রপাতের শিকার হন। ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, সদর উপজেলার অন্য একটি হাওরে কাজ করার সময় জামালগঞ্জ উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের যুবক আবু সালেহ (২২) বজ্রাঘাতে প্রাণ হারান। এ ছাড়া শান্তিগঞ্জ উপজেলার হাওরে কাজ করার সময় আরও তিন কৃষক গুরুতর আহত হয়েছেন। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেছেন।
নেত্রকোণার খালিয়াজুরী উপজেলায় বজ্রপাতের পৃথক তিনটি ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার সকালে জগন্নাথপুর ইউনিয়নের গোদারাঘাট এলাকায় ধনু নদে মাছ ধরার সময় আব্দুল মোতালিব (৫৫) নামে এক জেলের ওপর বজ্রপাত হলে তিনি ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান।
একই দিন দুপুরে সাতগাঁও গ্রামে মোনায়েম খাঁ পালান নামে এক কৃষক নিজ বাড়ির আঙিনায় ধান শুকাতে গিয়ে বজ্রাঘাতে মারা যান। বিকেলে উপজেলার কৃষ্ণপুরের ছায়ার হাওরে ধান কাটার সময় বজ্রপাতের কবলে পড়ে মারা যান শ্রমিক মো. শুভ মন্ডল। নিহত শুভ মন্ডলের স্থায়ী নিবাস সিরাজগঞ্জ জেলায়। খালিয়াজুরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, প্রতিটি ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনায় মায়ের চোখের সামনেই বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন মো. আরাফাত হোসেন (২০) নামে এক তরুণ। সোমবার দুপুর পৌনে তিনটার দিকে চরঈশ্বর ইউনিয়নের পূর্ব গামছাখালী গ্রামে এই দুর্ঘটনা ঘটে।
পেশায় কসমেটিকস ব্যবসায়ী আরাফাত তার মা শায়েলা আক্তারের সঙ্গে বাড়ির পাশের খেতে বাদাম সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন। কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ বজ্রপাত হলে আরাফাত সরাসরি আঘাতপ্রাপ্ত হন। তার মা অক্ষত থাকলেও আরাফাত ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। স্থানীয় ইউপি সদস্য রাশেদ উদ্দিন এবং হাতিয়া থানার ওসি কবির হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং, নবীগঞ্জ ও চুনারুঘাট উপজেলায় সোমবার ঝড় ও বজ্রপাতে মোট তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নবীগঞ্জ উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের মকসুদ আলী (৫০) বিকেলে হাওর থেকে গরু আনতে গিয়ে বজ্রপাতের শিকার হন এবং ঘটনাস্থলেই মারা যান। নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমীন জানিয়েছেন, নিহতের পরিবারকে সরকারি আর্থিক সহায়তা প্রদানের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে, ঝড়ের তাণ্ডবে দুর্ঘটনায় আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। চুনারুঘাট উপজেলার ছনখলা গ্রামের সিএনজি অটোরিকশাচালক সায়েদ আলী (৫০) যাত্রীবিহীন গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় ঝড়ের কবলে পড়েন। প্রবল বাতাসে তার গাড়িটি উল্টে গেলে তিনি নিচে চাপা পড়েন। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ ছাড়া বানিয়াচং উপজেলার আব্দুস সালাম (৬৫) নামে এক ব্যক্তি ঝড়ের সময় আহত হয়ে পরবর্তীতে মারা যান।
চলতি কালবৈশাখী মৌসুমের শুরুতেই বজ্রপাতের প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত রবিবার (২৬ এপ্রিল) একদিনেই দেশের সাতটি জেলায় ১৪ জনের মৃত্যু হয়। জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়:
গাইবান্ধা: সর্বাধিক ৫ জনের মৃত্যু।
ঠাকুরগাঁও, সিরাজগঞ্জ ও জামালপুর: প্রতিটি জেলায় ২ জন করে মোট ৬ জনের মৃত্যু।
পঞ্চগড়, বগুড়া ও নাটোর: প্রতিটি জেলায় ১ জন করে মোট ৩ জনের মৃত্যু।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, খোলা স্থানে কাজ করা কৃষক ও জেলেরা বজ্রপাতের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিশেষ করে এপ্রিল ও মে মাসে বজ্রপাত ও কালবৈশাখীর তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় জনগণকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, ঝড়ের পূর্বাভাস থাকলে বা মেঘের ঘনঘটা দেখলে খোলা আকাশ বা গাছের নিচে অবস্থান না করে দ্রুত পাকা দালানের নিচে আশ্রয় নেওয়া জরুরি। মৃতদের পরিবারের প্রতি স্থানীয় প্রশাসন সমবেদনা জ্ঞাপন করেছে এবং সরকারি বিধি মোতাবেক আর্থিক সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।