খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৩ মে ২০২৬
জামালপুর জেলা বিএনপি’র দুটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসংগঠন—শ্রমিক দল ও মৎস্যজীবী দলের শীর্ষ দুই নেতার মধ্যকার একটি বিতর্কিত ফোনালাপের অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রায় এক মিনিট দৈর্ঘ্যের এই অডিও ক্লিপটি গত শনিবার (২ মে) ‘ইকতিয়ার হোসেন সাগর’ নামক একটি ফেসবুক আইডি থেকে প্রকাশিত হওয়ার পর স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। ফোনালাপটিতে এক নেতার বিরুদ্ধে অন্য নেতাকে ‘চুরির’ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনতে এবং অত্যন্ত কড়া ভাষায় তিরস্কার করতে শোনা যায়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ওই কথোপকথনটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর শুরুতেই জামালপুর জেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি আব্দুল হালিম অপর প্রান্তে থাকা জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি শেখ মো. আব্দুস সোবহানকে সালাম প্রদান করেন। কিন্তু সালামের প্রত্যুত্তর না দিয়ে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ কণ্ঠে শেখ মো. আব্দুস সোবহান তাকে ‘চোর’ বলে সম্বোধন করেন।
ফোনালাপের উল্লেখযোগ্য অংশগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
আব্দুল হালিম: ভাই, আসসালামু আলাইকুম। শেখ মো. আব্দুস সোবহান: এই চোরের বাচ্চা ফোন ধরোস না কেন। মাইনসের জিনিস চুরি করে আরেক জায়গায় দিছোস, ফোন ধরোস নাই কেন? আব্দুল হালিম: ভাই কারে বলতাছেন। শেখ মো. আব্দুস সোবহান: তোর বাপেরে ডাক দিয়ে নিয়ে আইসা এখানে চুরি শেষ করোস না কেন? এই চোর তোরেই কইতাছি চোর। তোরে বলতাছি তুই চুরি করছোস কেন বে? আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তুই চুরি করছোস কোন হিসাবে। আব্দুল হালিম: আরে ভাই আপনি ব্যবহার ভালো করেন, আপনার সঙ্গে তো আমার এই সম্পর্ক না। শেখ মো. আব্দুস সোবহান: না না আমি কোন সম্পর্ক মারি আমি? আমার হাজার হাজার নেতাকর্মীর সামনে অপমান করে সম্পর্ক দেখাও? সম্পর্কের আমি (অশ্রাব্য শব্দ)…। তুই চুরি করছোস, তুই আমারে না বলে চুরি করলি কেন? আব্দুল হালিম: আরে ভাই এটা আমিনুল আর শাহিন মাস্টারকে বলেন, আমারে কেন?
ফোনালাপটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় পর্যায়ে নানা গুঞ্জন তৈরি হলে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট নেতাদের সাথে যোগাযোগ করা হয়। ঘটনার প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি শেখ মো. আব্দুস সোবহান জানান, এই বিবাদের মূল কারণ ছিল স্থানীয় বালুঘাটের ইজারা সংক্রান্ত বিষয়।
তার দাবি অনুযায়ী, বালুঘাটের ইজারার জন্য ব্যাংক ড্রাফট (বিডি) জমা দেওয়ার বিষয়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল। আব্দুল হালিমকে সেই সিদ্ধান্ত মোতাবেক বিডিগুলো ড্রপ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু আব্দুল হালিম সংগঠনের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত অমান্য করে সবার ব্যাংক ড্রাফটগুলো লুকিয়ে ফেলেন এবং নিজের সুবিধামতো বিডি ড্রপ করেন। শেখ মো. আব্দুস সোবহানের মতে, সংগঠনের সকলের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে একক সিদ্ধান্তে কাজ করা এবং বিডি সরিয়ে ফেলাকে তিনি ‘চুরি’ হিসেবে গণ্য করেছেন। তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে, এই কথোপকথনটি গত ১৯ এপ্রিলের।
অন্যদিকে, চুরির অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি কোনো অস্বীকার বা সমর্থন না জানিয়ে জেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি আব্দুল হালিম সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া দেন। তিনি জানান, ভাইরাল হওয়া অডিও ক্লিপে যা শোনা গেছে, সেটিই তার বক্তব্য এবং এই বিষয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই।
জামালপুর জেলায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এবং নেতাদের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বালুঘাটের ইজারার মতো অর্থনৈতিক বিষয়ের সাথে দলীয় নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততা এবং তা নিয়ে প্রকাশ্য বিবাদ জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
উল্লেখযোগ্য যে, এই ঘটনার সমসাময়িক সময়ে একজন সাবেক ছাত্রদল নেতার ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়ে রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাটিও স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচনার খোরাক জোগাচ্ছে। যদিও এই দুই ঘটনার মধ্যে সরাসরি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক যোগসূত্র পাওয়া যায়নি, তবে দলীয় কোন্দল ও অডিও ফাঁসের ঘটনাটি দলের ভাবমূর্তির জন্য অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, ইজারা সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেন এবং দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা গ্রহণের অভিযোগগুলো তৃণমূল রাজনীতিতে বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। এই অডিও ক্লিপটি কেবল দুই ব্যক্তির মধ্যকার ঝগড়া নয়, বরং স্থানীয় রাজনীতিতে বিদ্যমান আধিপত্য বিস্তার ও অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্বকেও সামনে নিয়ে এসেছে। বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে এবং দলীয় হাই কমান্ড এই বিষয়ে কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।