খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৭ মে ২০২৬
পবিত্র মক্কা নগরীর মসজিদুল হারামে অবস্থিত কাবাগৃহের ঠিক সামনে একটি ঐতিহাসিক ও বরকতময় নিদর্শন রয়েছে, যা ইসলামে ‘মাকামে ইব্রাহিম’ নামে সুপরিচিত। এটি মূলত একটি জান্নাতি পাথর, যার ওপর দাঁড়িয়ে মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) পবিত্র কাবাঘরের পুনর্নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেছিলেন। ইসলামি ঐতিহ্য ও ইতিহাস অনুযায়ী, এটি কোনো সাধারণ জড়বস্তু নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে মহান আল্লাহর এক অনন্য অলৌকিক ক্ষমতা। কাবাঘরের প্রাচীর নির্মাণের সময় রাজমিস্ত্রির কাজের সুবিধার্থে উচ্চতার প্রয়োজন অনুসারে পাথরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কখনো উপরে উঠত এবং কখনো নিচে নামত। এছাড়া অত্যন্ত শক্ত পাথর হওয়া সত্ত্বেও এটি কাদার মতো নরম হয়ে হজরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর পায়ের চাপ গ্রহণ করে, যার ফলে পাথরটিতে আজও তাঁর পবিত্র পদযুগলের স্পষ্ট ছাপ সংরক্ষিত রয়েছে।
পবিত্র কোরআনে উল্লেখ ও হজের ঐতিহাসিক ঘোষণা
এই অলৌকিক পাথরের মাহাত্ম্য ও কুদরতের কথা পবিত্র কোরআনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সুরা আলে ইমরানের ৯৭ নম্বর আয়াতে বলেন, ‘এতে (কাবাগৃহে) রয়েছে সুস্পষ্ট নিদর্শনাদি, এরমধ্যে একটি হলো মাকামে ইব্রাহিম।’
পবিত্র কাবা শরিফের নির্মাণকাজ পুরোপুরি সমাপ্ত হওয়ার পর আল্লাহ তাআলা নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-কে আদেশ করেন যেন তিনি সমগ্র মানবজাতিকে হজের জন্য আহ্বান করেন। এই মর্মে সুরা হজ্জের ২৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর আপনি মানুষের মাঝে হজের ঘোষণা দিন, তারা আপনার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং প্রত্যেক ক্ষীণকায় উটে চড়ে দূর-দূরান্ত থেকে।’ আল্লাহর এই আদেশ পাওয়ার পর হজরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) এই পাথরের ওপর দণ্ডায়মান হয়ে বিশ্ববাসীকে হজের আহ্বান জানান। মহান আল্লাহর কুদরতে তাঁর সেই ডাক অলৌকিকভাবে কেয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে আগমনকারী সমস্ত মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ইসলামি তফসিরবিদদের মতে, রুহের জগতে অবস্থানকালীন সময়ে যেসব মানুষের কপালে হজ পালনের সৌভাগ্য লেখা রয়েছে, তারা সবাই সেদিন ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর সেই পবিত্র আহ্বানের জবাবে ‘লাব্বাইক’ বা ‘আমি উপস্থিত’ বলে সাড়া দিয়েছিলেন।
জান্নাতি পাথর ও কাবার ইতিহাসে এর অবস্থান
মাকামে ইব্রাহিম যে একটি অত্যন্ত পবিত্র ও জান্নাতি পাথর, তা মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। সুনানে তিরমিজির ৮৭৮ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইব্রাহিম জান্নাতের ইয়াকুত পাথরসমূহের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা এ দুটির জ্যোতি নিস্তেজ করে দিয়েছেন। তিনি যদি এগুলোর আলো ম্লান না করতেন, তবে এ দুটো পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত সমগ্র পৃথিবীকে আলোকিত করে দিত।’
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসলামের প্রারম্ভিক যুগের পূর্বে এই বরকতময় পাথরটি পবিত্র কাবাঘরের অভ্যন্তরেই সংরক্ষিত ছিল। তবে ইসলামপূর্ব জাহেলিয়াতের যুগে মক্কার কুরাইশরা এটিকে কাবার ভেতর থেকে বের করে এনে দরজার নিকট স্থাপন করে। পরবর্তীতে ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ার পর এবং মহান আল্লাহ তাআলা এই স্থানটিকে নামাজের স্থান হিসেবে নির্ধারণ করার নির্দেশ দিলে, পাথরটিকে দরজা থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে বর্তমান স্থানে আনা হয়। বর্তমানে এটি পবিত্র কাবা শরিফ থেকে আনুমানিক ১০ কিংবা ১১ মিটার দূরে একটি আধুনিক ও অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন কাচের গম্বুজের মধ্যে সর্বসাধারণের দেখার জন্য সুরক্ষিত অবস্থায় রাখা রয়েছে।
নিচে মাকামে ইব্রাহিমের ধর্মীয় বিধান, ঐতিহাসিক তথ্য ও হাদিসের উৎসসমূহ একটি টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয়ের সূচক ও বিবরণ | সুনির্দিষ্ট তথ্য ও অবস্থান | ইসলামি গ্রন্থ ও দলিল সূত্র |
| পাথরের মূল উৎস | জান্নাত বা বেহেশতের ইয়াকুত পাথর | সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৮৭৮ |
| অলৌকিক বৈশিষ্ট্য | প্রয়োজন অনুযায়ী উঁচু-নিচু হওয়া এবং পায়ের ছাপ ধারণ করা | তাফসিরে মাআরিফুল কুরআন, ২/১০৩ |
| ঐতিহাসিক গুরুত্ব | এই পাথরে দাঁড়িয়ে হজরত ইব্রাহিম (আ.) কর্তৃক হজের আহ্বান | তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৫/৪৪১ |
| বর্তমান অবস্থান | পবিত্র কাবা শরিফ থেকে ১০ কিংবা ১১ মিটার দূরে কাচের গম্বুজে | মক্কা হারাম শরিফের ভৌগোলিক তথ্য |
| ইবাদতের প্রধান বিধান | তওয়াফ সম্পন্ন করার পর এর পেছনে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা সুন্নত | সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯৫ |
| বিকল্প নামাজের স্থান | কাবার সামনে সম্ভব না হলে হারাম শরিফের ভেতরের যেকোনো স্থান | মানাসিকে মোল্লা আলি কারি, পৃষ্ঠা ১৯৯-২০০ |
মাকামে ইব্রাহিমে নামাজের ধর্মীয় বিধান
ইসলামি শরিয়তে মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে নামাজ আদায়ের বিশেষ ফজিলত ও গুরুত্ব রয়েছে। বিদায় হজের সময় প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাবার তওয়াফ শেষ করে কাবার দিকে মুখ করে এমনভাবে নামাজে দাঁড়িয়েছিলেন, যাতে তাঁর এবং কাবাঘরের মাঝখানে মাকামে ইব্রাহিম পাথরটি অবস্থান করে। সেই আদর্শ অনুযায়ী, প্রতিটি হজ ও ওমরাহ পালনকারীর জন্য তওয়াফ শেষ করার পর দুই রাকাত নামাজ আদায় করা ওয়াজিব এবং এই ওয়াজিব নামাজটি মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে দাঁড়িয়ে আদায় করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। তবে হজের দিনগুলোতে প্রচণ্ড ভিড় বা অন্য কোনো বিশেষ কারণে যদি এই পাথরের ঠিক পেছনে নামাজ পড়ার জায়গা না পাওয়া যায়, তবে হারাম শরিফের সীমানার ভেতরে অন্য যেকোনো স্থানে এই নামাজ আদায় করে নিলে তা সম্পূর্ণরূপে বৈধ ও গ্রহণযোগ্য হবে।