ভারতের শেয়ারবাজারে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের অর্থ প্রত্যাহারের ধারা টানা কয়েক মাস ধরে অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ মে মাসে দেশটির পুঁজিবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ তুলে নিয়েছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামা এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা—এই তিনটি প্রধান কারণ এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করছে।
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, মে মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতের শেয়ারবাজার থেকে প্রায় ৩২ হাজার ৯৬৩ কোটি রুপি প্রত্যাহার করেন। এর ফলে টানা তিন মাস ধরে তারা নিট বিক্রেতার অবস্থানে রয়েছেন। চলতি বছরের শুরু থেকে এই প্রবণতা ওঠানামার মধ্যেও সামগ্রিকভাবে বহির্গমনের দিকেই ঝুঁকে রয়েছে।
এর আগের মাসগুলোর চিত্র আরও অস্থির ছিল। এপ্রিলে বিদেশি অর্থপ্রবাহ কমে গিয়ে প্রায় ৬০ হাজার ৮৪৭ কোটি রুপি প্রত্যাহার হয়। মার্চ মাসে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক ছিল; ওই মাসে প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার ৭৭৫ কোটি রুপি বাজার থেকে বেরিয়ে যায়, যা বছরের একক মাসে সর্বোচ্চ বহির্গমন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফেব্রুয়ারিতে অবশ্য ব্যতিক্রম দেখা যায়, ওই মাসে প্রায় ২২ হাজার ৬১৫ কোটি রুপি পুনরায় বাজারে প্রবেশ করেছিল। জানুয়ারিতে আবারও প্রায় ৩৫ হাজার ৯৬২ কোটি রুপি প্রত্যাহার করা হয়।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত মোট হিসাব অনুযায়ী, ভারতের শেয়ারবাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট নিট প্রত্যাহারের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার ৯৩২ কোটি রুপি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামগ্রিক বহির্গমন অব্যাহত থাকলেও মাসভিত্তিক অর্থ প্রত্যাহারের গতি ধীরে ধীরে কিছুটা কমতে শুরু করেছে, যা ভবিষ্যতে বাজারে আংশিক স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দিতে পারে।
নিচে মাসভিত্তিক অর্থপ্রবাহের সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো—
মাস
বিদেশি অর্থপ্রবাহের অবস্থা
জানুয়ারি
প্রায় ৩৫ হাজার ৯৬২ কোটি রুপি প্রত্যাহার
ফেব্রুয়ারি
প্রায় ২২ হাজার ৬১৫ কোটি রুপি বিনিয়োগ প্রবাহ
মার্চ
প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার ৭৭৫ কোটি রুপি প্রত্যাহার
এপ্রিল
প্রায় ৬০ হাজার ৮৪৭ কোটি রুপি প্রত্যাহার
মে
প্রায় ৩২ হাজার ৯৬৩ কোটি রুপি প্রত্যাহার
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেছে। অপরিশোধিত তেলের দাম এক পর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি একশো ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, যা আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরির আশঙ্কা সৃষ্টি করে। এর ফলে উদীয়মান বাজারগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কিছুটা কমে যায়।
এছাড়া ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার দুর্বল অবস্থানও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রুপির মান কমে যাওয়ায় তারা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বাজারে ওঠানামার সময়ে দ্রুত মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা সামগ্রিক অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
তবে এর মধ্যেও ভারতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি কিছু খাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রয়েছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব খাতে দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা থাকলেও সামগ্রিকভাবে বিদেশি অর্থপ্রবাহে ধীরগতি বিনিয়োগ পরিবেশে অনিশ্চয়তার ছায়া তৈরি করছে। ফলে নিকট ভবিষ্যতে বাজারে বিদেশি অর্থপ্রবাহের গতিপথ বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও স্থানীয় অর্থনৈতিক নীতির ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।