খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৩১ মে ২০২৬
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার দেউলা গ্রামে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর মা-ছেলে জোড়া হত্যাকাণ্ডের জট খুলেছে একটি সাধারণ মুঠোফোনের সূত্র ধরে। হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে লুট হওয়া একটি মুঠোফোন দীর্ঘ প্রায় এক বছর ধরে আটবার হাতবদল হয়েছিল। নামমাত্র মূল্যে বিক্রি হওয়া এই ফোনটির অবস্থান শনাক্তকরণের মাধ্যমেই পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) দীর্ঘদিনের ‘ক্লুলেস’ এই খুনের মূল পরিকল্পনাকারী ও আসামিদের আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয়।
হত্যাকাণ্ড ও প্রাথমিক তদন্তের ব্যর্থতা
২০১৪ সালের ২৩ নভেম্বর রাতে বাগমারা উপজেলার দেউলা গ্রামে নিজ বাড়িতে নৃশংসভাবে খুন হন আকলিমা বেওয়া (৫৫) এবং তাঁর তরুণ ছেলে জাহিদ হাসান (২৮)। অপরাধীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করে তাঁদের হত্যা করে। ঘটনার পরদিন, অর্থাৎ ২৪ নভেম্বর আকলিমার আরেক ছেলে দুলাল উদ্দিন বাদী হয়ে বাগমারা থানায় একটি অজ্ঞাতনামা হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার পর বাগমারা থানা-পুলিশ প্রাথমিক তদন্ত শুরু করে এবং সন্দেহভাজন হিসেবে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। তবে দীর্ঘ তদন্তেও তাদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ মেলেনি এবং মামলার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশ সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।
তদন্তভার হস্তান্তর ও পিবিআই-এর কৌশলী পদক্ষেপ
হত্যাকাণ্ডের এক বছর পর মামলার কোনো সুরাহা না হওয়ায় এর তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। দায়িত্ব নেওয়ার পর পিবিআই-এর তদন্তকারী দল ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে অনুসন্ধান শুরু করে। তারা জানতে পারে, হত্যাকাণ্ডের পর থেকে নিহত আকলিমার একটি মুঠোফোন নিখোঁজ রয়েছে। পিবিআই তখন ওই মুঠোফোনের আইএমইআই (IMEI) নম্বর ধরে প্রযুক্তিগত অনুসন্ধান শুরু করে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ফোনটি রাজশাহী থেকে দেশের বিভিন্ন জেলা ঘুরে তত দিনে নেত্রকোনার এক ব্যক্তির হাতে পৌঁছেছে। পিবিআই প্রতিটি হাতবদলের পর্যায়ক্রম, ফোনের ক্রেতা ও বিক্রেতার পরিচয় এবং স্থান অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করে। জানা যায়, ফোনটি কখনো ৫০০ টাকা আবার কখনো ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এই হাতবদলের সূত্র ধরে পিবিআই একে একে সাতজনকে গ্রেপ্তার করে এবং শেষ পর্যন্ত ফোনটি প্রথম চুরিকারী তথা হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারী হাবিবুর রহমানের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
পারিবারিক বিরোধ এবং খুনের নীলনকশা
পিবিআই সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত ‘পরিচয়হীন অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ এবং ক্লুলেস মার্ডার মামলার তদন্ত’ শীর্ষক বইয়ের বিবরণ এবং মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের পারিবারিক ও স্থানীয় বিরোধ। নিহত আকলিমার সঙ্গে তাঁর চাচাতো দেবর ও স্থানীয় মাতবর আবুল হোসেন মাস্টারের জমিজমা ও অন্যান্য বিষয়ে পারিবারিক বিরোধ ছিল। অন্যদিকে, প্রতিবেশী হাবিবুর রহমানের সঙ্গে মাদক ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আকলিমার বিরোধ চলছিল। এই দুই ব্যক্তি আকলিমাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য যৌথভাবে খুনের পরিকল্পনা করেন।
পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য হাবিবুর রহমান পার্শ্ববর্তী দুর্গাপুর উপজেলা থেকে পাঁচজন পেশাদার ভাড়াটে খুনি সংগ্রহ করেন। খুনিদের নেতৃত্ব দিয়েছিল বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) চাকরিচ্যুত সদস্য আবদুর রাজ্জাক।
অপরাধ সংঘটন ও পলায়ন
২০১৪ সালের ২৩ নভেম্বর রাতে পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূর থেকে ভাড়াটে খুনিদের মোটরসাইকেলে পথ দেখিয়ে আকলিমার বাড়ির সামনে নিয়ে আসেন মূল পরিকল্পনাকারী আবুল হোসেন মাস্টার। রাত সাড়ে ৮টা থেকে সোয়া ৯টার মধ্যে খুনিরা ঘরে ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আকলিমা ও তাঁর ছেলেকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এই সময় বাইরে একজন মোটরসাইকেল নিয়ে পাহারায় নিযুক্ত ছিলেন। হত্যাকাণ্ড শেষে হাবিবুর রহমান আকলিমার মুঠোফোনটি সঙ্গে নিয়ে যান এবং খুনি চক্র দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
আদালতের রায় ও বিচারিক চূড়ান্তকরণ
পিবিআই-এর পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে এই মামলার রায় ঘোষণা করেন বিজ্ঞ আদালত। আদালত অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনা করে তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং চারজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন।
নিচে মামলার রায় এবং দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের বিস্তারিত বিবরণ সারণী আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক | আসামির নাম | সামাজিক/পেশাগত পরিচয় | অপরাধে ভূমিকা | আদালতের রায় |
| ০১ | আবুল হোসেন মাস্টার | নিহত আকলিমার চাচাতো দেবর ও স্থানীয় মাতবর | প্রধান পরিকল্পনাকারী ও খুনিদের পথপ্রদর্শক | মৃত্যুদণ্ড |
| ০২ | হাবিবুর রহমান | নিহত আকলিমার প্রতিবেশী | সহ-পরিকল্পনাকারী, ভাড়াটে খুনি সংগ্রহকারী ও ফোন লুটকারী | মৃত্যুদণ্ড |
| ০৩ | আবদুর রাজ্জাক | দেবীপুর, দুর্গাপুরের বাসিন্দা এবং বিজিবির চাকরিচ্যুত সদস্য | ভাড়াটে খুনি চক্রের মূল নেতা ও প্রত্যক্ষ হত্যাকারী | মৃত্যুদণ্ড |
| ০৪ | আবদুল্লাহ আল কাফি | শ্যামপুর, দুর্গাপুরের বাসিন্দা | হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ গ্রহণকারী | যাবজ্জীবন কারাদণ্ড |
| ০৫ | রুহুল আমিন | শ্যামপুর, দুর্গাপুরের বাসিন্দা | হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ গ্রহণকারী | যাবজ্জীবন কারাদণ্ড |
| ০৬ | রুস্তম আলী | খিদ্রকাশিপুর গ্রামের বাসিন্দা | হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ গ্রহণকারী | যাবজ্জীবন কারাদণ্ড |
| ০৭ | মনিরুল ইসলাম ওরফে মনির | খিদ্রলক্ষ্মীপুর গ্রামের বাসিন্দা | হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ গ্রহণকারী | যাবজ্জীবন কারাদণ্ড |
এই মামলার বিষয়ে পিবিআই-এর তৎকালীন প্রধান ও পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল জানান, কোনো প্রত্যক্ষদর্শী বা প্রাথমিক সূত্র না থাকা এই জোড়া খুনের মামলার একমাত্র ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র ছিল একটি লুণ্ঠিত মুঠোফোন। আটবার হাতবদল হওয়া সেই ফোনের আইএমইআই ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় পর হলেও একটি জট পাকানো খুনের রহস্যের সফল উন্মোচন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।