খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১ জুন ২০২৬
ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের পদত্যাগের গুঞ্জনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তবে তেহরান প্রশাসন এই খবরকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘মিডিয়া গেইম’ বা গণমাধ্যমের অপপ্রচার বলে জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, ইরান তার জাতীয় ঐক্য ও সংহতির পথ থেকে কোনো অবস্থাতেই বিচ্যুত হবে না।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘ইরান ইন্টারন্যাশনাল’-এর একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, গত ৩১ মে (রোববার) ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দেশটির সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ে তাঁর আনুষ্ঠানিক পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অবিলম্বে পদত্যাগের অনুমতি চেয়ে পেজেশকিয়ান ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মোজতাবা খামেনির কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন।
দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা দাবি করে আসছেন যে, ইরানের বর্তমান সরকার এবং দেশটির সামরিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গভীর অভ্যন্তরীণ বিভেদ বিদ্যমান। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো এই দাবির সপক্ষে বিভিন্ন সময় নানামুখী সংবাদ প্রচার করে আসছে।
ইরান ইন্টারন্যাশনাল এর আগের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল যে, ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি) ধীরে ধীরে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা সংকুচিত করে ফেলেছে। এর ফলে কার্যত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অংশগুলোর নিয়ন্ত্রণ আইআরজিসির হাতে চলে গেছে, যা পেজেশকিয়ান প্রশাসনে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছে।
সংবাদমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতার কাছে পাঠানো চিঠিতে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান উল্লেখ করেছেন যে—
দেশের মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর নির্বাচিত সরকারকে সম্পূর্ণ বাইরে রাখা হয়েছে।
এই প্রশাসনিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে আইআরজিসি’র কট্টরপন্থি গোষ্ঠীগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের সংবিধান অনুযায়ী সরকারের কার্যক্রম পরিচালনা করা এবং নিজের আইনগত ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
সংবাদ বিশ্লেষকদের মতে, এই পদত্যাগপত্রের বিষয়টি যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা ইরানের ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তরে একটি গভীর এবং নজিরবিহীন ফাটল বা বিভেদের স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।
প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের এই খবরটি প্রকাশ্যে আসার পরপরই তেহরান প্রশাসনের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বিবৃতিতে ইরানের রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের যোগাযোগবিষয়ক উপপ্রধান মেহদি তাবাতাবায়ি এই দাবি সম্পূর্ণ নাকচ করে দেন। তিনি এটিকে বিদেশি গণমাধ্যমের পূর্বপরিকল্পিত অপপ্রচারের অংশ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
দেশের অভ্যন্তরে কোনো ধরনের বিভক্তি বা ফাটল ধরার জল্পনাকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, যারা ইরানের জাতীয় ঐক্য ও সংহতিকে দুর্বল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, তাদের সেই ইচ্ছা পূরণ হবে না এবং এই ব্যর্থ ইচ্ছা নিয়েই তাদের বিদায় নিতে হবে। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান কখনোই ইরানের জনগণের সেবা করার অঙ্গীকার থেকে পিছিয়ে আসবেন না।
সংবাদটির মূল উপাদান ও পক্ষগুলোর অবস্থান নিচে টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| পক্ষ/প্রতিষ্ঠান | দাবিকৃত তথ্য ও অবস্থান | সরকারি প্রতিক্রিয়া/বক্তব্য |
| প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান | সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়া এবং আইআরজিসি কর্তৃক ক্ষমতা সীমিতকরণের অভিযোগে সর্বোচ্চ নেতার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার দাবি। | পদের দায়িত্বে বহাল আছেন এবং জনগণের সেবা থেকে তিনি কখনো সরে দাঁড়াবেন না বলে জানানো হয়েছে। |
| ইরান ইন্টারন্যাশনাল ও পশ্চিমা গণমাধ্যম | গত ৩১ মে মোজতাবা খামেনির কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে পদত্যাগের অনুমতি চাওয়ার দাবি এবং প্রশাসনিক অচলাবস্থার চিত্র তুলে ধরা। | এই ধরনের প্রতিবেদনকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, গুজব এবং বিদেশি শক্তির ‘মিডিয়া গেইম’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। |
| প্রেসিডেন্টের কার্যালয় (মেহদি তাবাতাবায়ি) | অভ্যন্তরীণ বিভেদের সকল জল্পনা নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। | ইরানের জাতীয় ঐক্য অটুট রয়েছে এবং এই ঐক্য বিনষ্ট করার চেষ্টা সফল হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। |
| আইআরজিসি (ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস) | কট্টরপন্থি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কার্যত রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক ক্ষমতা নিজেদের হাতে নেওয়ার অভিযোগ। | সরকারের পক্ষ থেকে এই ধরনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বা প্রশাসনিক অচলাবস্থার দাবি অস্বীকার করা হয়েছে। |