খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬
ময়মনসিংহ মহানগরীর ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের চরঈশ্বরদিয়া মধ্যপাড়া গ্রামে রাজনৈতিক ও স্থানীয় বিরোধের জেরে এক অটোরিকশাচালককে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করার ঘটনা ঘটেছে। নিহত যুবকের নাম রানা মিয়া (২৮)। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে তার পরিবার দাবি করেছে। এই বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় মূল অভিযুক্ত হিসেবে ময়মনসিংহ মহানগর জামায়াতে ইসলামীর কর্মপরিষদ সদস্য মফিদুল ইসলাম মাস্টারের ছেলে মাহিনের নাম উঠে এসেছে। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত মাহিন বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। আজ মঙ্গলবার (২ জুন, ২০২৬) বিকেল ৫টার দিকে চরঈশ্বরদিয়া মধ্যপাড়া গ্রামের গাঙ্গের বাড়িতে এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটে। এই ঘটনায় নিহতের পক্ষীয় আরও অন্তত পাঁচজন ব্যক্তি গুরুতর আহত হয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও নিহতের পারিবারিক সূত্র থেকে জানা গেছে, নিহত রানা মিয়া একই এলাকার বাসিন্দা শরাফ উদ্দিনের ছেলে। তিনি পেশায় একজন অটোরিকশাচালক ছিলেন এবং স্থানীয়ভাবে বিএনপির সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। নিহত রানার আত্মীয় মাহাবুল ঘটনার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে জানান যে, বিগত জাতীয় নির্বাচনে তারা দলগতভাবে বিএনপির পক্ষে সরাসরি কাজ করেছিলেন এবং ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিয়েছিলেন। এরপর থেকেই মূলত স্থানীয় জামায়াত নেতা মফিদুল ইসলাম মাস্টারের পরিবারের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক বিরোধ ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব চলে আসছিল।
এই দীর্ঘদিনের বিরোধের রেশ ধরে গত সোমবার মফিদুল মাস্টারের বাড়ির ছেলেরা স্থানীয় মাঠে ফুটবল খেলা শেষ করে রানাদের বাড়ির সামনের একটি দোকানে পানীয় ক্রয় করতে আসে। সেই সময় দোকানে উপস্থিত ভিকটিম রানার পক্ষের কিছু লোক মফিদুল মাস্টারের বাড়ির ছেলেদের উদ্দেশ্য করে স্থানীয় একজন কাউন্সিলর প্রার্থীর পক্ষে পানীয় খাচ্ছে বলে কটূক্তি করে এবং হেয় প্রতিপন্ন করে কথা বলে। এই ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে মফিদুল মাস্টারের বাড়ির ছেলেরা তাদের দেখে নেওয়ার এবং মারধরের হুমকি প্রদান করে সেখান থেকে চলে যায়।
পানের দোকানে ঘটে যাওয়া উক্ত ঘটনার জের ধরে সোমবার গভীর রাতে মফিদুল মাস্টারের বাড়ির ছেলেরা একত্রিত হয়ে পুনরায় রানাদের বাড়িতে এসে অতর্কিত হামলা চালায়। গভীর রাতে হামলা ও উত্তেজনার খবর পেয়ে জামায়াত নেতা মফিদুল মাস্টার নিজে উদ্যোগী হয়ে রানাদের বাড়িতে আসেন। তিনি উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি সামাজিকভাবে মীমাংসা বা আপস-নিষ্পত্তি করে নিজ বাসায় ফিরে যান।
তবে সোমবার রাতের সামাজিক মীমাংসার পরও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। নিহতের স্বজনদের অভিযোগ অনুযায়ী, আজ মঙ্গলবার বিকেলে মফিদুল মাস্টার আকস্মিকভাবে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন বহিরাগত ও স্থানীয় লোকজনের একটি দল নিয়ে পুনরায় রানাদের গাঙ্গের বাড়িতে এসে অতর্কিত হামলা চালান। এই পরিকল্পিত ও সশস্ত্র হামলার সময় উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
বিকেলে সংঘটিত এই দ্বিতীয় দফার হামলার একপর্যায়ে মফিদুল মাস্টারের ছেলে মাহিন তার কাছে থাকা ধারালো ছুরি দিয়ে রানা মিয়ার বুকের পাশে সজোরে আঘাত করেন। ছুরির আঘাতে রানা মিয়ার বুকের অংশ গভীরভাবে কেটে যায় এবং তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এই হামলার ঘটনায় রানাকে বাঁচাতে গিয়ে তার পক্ষের আরও পাঁচজন ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত ও জখম হন।
হামলায় আহত ব্যক্তিরা হলেন—আশাদ (৩৬), মোফাজ্জল (৩৫), শাহান (৪৫), মুনসুর আলী (৫০), শাকিল (৩০) এবং দিনি মিয়া (৩৫)। ঘটনার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দারা ও নিহতের স্বজনেরা রক্তাক্ত অবস্থায় রানাসহ বাকি আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে নেওয়ার পর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে রানা মিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতালে ভাইয়ের মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহতের ভাই তোফাজ্জল হোসেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, তার ভাইকে সম্পূর্ণ বিনা কারণে এবং পূর্ব শত্রুতার জেরে মফিদুল মাস্টারের ছেলে মাহিন ছুরি দিয়ে বুকে আঘাত করে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। তিনি তার ভাইয়ের হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং আদালতে সর্বোচ্চ শাস্তি বা ফাঁসির দাবি জানান।
অন্যদিকে, এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে এবং হামলার অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে ময়মনসিংহ মহানগর জামায়াতে ইসলামীর কর্মপরিষদ সদস্য মফিদুল ইসলাম মাস্টার সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি করেন। তিনি তার এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি হামলার ঘটনার সময় ওই স্থানে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত ছিলাম না। এমনকি আমার ছেলেও সেখানে উপস্থিত ছিল না। আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে আমাদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ মিথ্যা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।”
হত্যাকাণ্ডের এই স্পর্শকাতর ঘটনাটি নিশ্চিত করে ময়মনসিংহের কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, খবর পাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নিহত রানা মিয়ার মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
ওসি আরও জানান, ঘটনাস্থল ও এর আশপাশের এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে অতিরিক্ত পুলিশি নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত অভিযুক্তদের আইনগতভাবে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় নিয়মিত মামলা দায়ের করার আইনি প্রক্রিয়া বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।